সারাংশ
পশ্চিমা ধর্মতত্ত্বে যে প্রশ্নগুলো ঈশ্বরের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে—যেমন দুঃখের সমস্যা, কর্মফলের বিচার, বা সৃষ্টির উদ্দেশ্য—সেগুলো অদ্বৈত বেদান্তে কোনো সমস্যাই নয়। অদ্বৈতে সবকিছু একটি অখণ্ড ব্রহ্ম, এবং জগৎ মায়ার খেলা মাত্র। বাঙালি সমাজে শাক্ত তান্ত্রিক ঐতিহ্য, বিশেষ করে বামাচারী পথ, দীর্ঘদিন ধরে বহির্জগতের সমালোচনা ও অপমানের শিকার। সাতশো বছর আগের সর্বানন্দ ঠাকুরের ঘটনা থেকে শুরু করে আধুনিক কালে শ্রীমৎ পরমাত্মানন্দনাথ ভৈরব গিরি জীর জগদ্গুরু পদে অভিষেক—এটি একটি ঐতিহাসিক প্রায়শ্চিত্ত। অদ্বৈত দর্শনের আলোকে, অবধূত অবস্থা হলো সর্বোচ্চ মুক্তি, যেখানে সকল দ্বৈততা লয় হয়ে যায়। এই লেখায় তান্ত্রিক সন্ন্যাসের শাস্ত্রীয় ভিত্তি, অবধূতের লক্ষণ এবং আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করব।
যুক্তি ও তথ্য:
বাঙালি আদতে শাক্ত, এবং তাদের অনেকের মধ্যে বামাচারী পথ প্রচলিত। পঞ্চমকার (মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন) দেবী উপাসনার অংশ, কিন্তু বাংলার বাইরে এ নিয়ে বিতর্ক অবিরাম। শাস্ত্রে কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন না থাকায়, পাড়ায় পাড়ায় স্বঘোষিত গুরুরা বিভ্রান্তি ছড়ায়। সাতশো বছর আগে, প্রখ্যাত বাঙালি তান্ত্রিক সর্বানন্দ ঠাকুর (দশমহাবিদ্যা সিদ্ধ মেহারের সর্বানন্দ) কাশীতে বামাচারী হওয়ার জন্য বৈদিক দণ্ডীস্বামীদের দ্বারা তাড়িত হন। 'সর্বানন্দতরঙ্গিনী' গ্রন্থে বর্ণিত:
এখানে সমস্যা হলো বৈদিক ও তান্ত্রিক সন্ন্যাসের পার্থক্য। বৈদিক সন্ন্যাস উপনিষদভিত্তিক (যেমন সন্ন্যাসোপনিষদ, হংসোপনিষদ), যেখানে মহাবাক্য 'প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম' প্রধান। অন্যদিকে, তান্ত্রিক সন্ন্যাস মহানির্বাণ তন্ত্র, বীরচূড়ামণি ইত্যাদিতে বর্ণিত। উভয়ের আদি গুরু দত্তাত্রেয়, যাঁর অবধূতগীতা সকল অদ্বৈতবাদী মেনে চলে।
অবধূত কী?
অদ্বৈত দর্শনে, এটি সর্বোচ্চ অবস্থা:
“অক্ষরত্বাৎ বরেণ্যত্বাৎ ধূত সংসার বংধনাৎ।তত্ত্বমস্যর্থ সিদ্ধত্বাদবধূতোহভিধীয়তে।।”
যিনি অক্ষর, বরেণ্য, সংসারবন্ধনমুক্ত, 'তত্ত্বমসি'র মূর্তি—তিনি অবধূত।
মহানির্বাণ তন্ত্রে তান্ত্রিক সন্ন্যাসের বিধি: আত্মশ্রাদ্ধ, বিরজা হোম। অবধূতের প্রকারভেদ:
- শৈবাবধূত (সংসারে থেকে কৌল সাধনা)।
- পরিব্রাজক (তীর্থাটন সহ)।
- পূর্ণাবধূত (কৌপীনধারী, দূতীযাগী)।
- যতি বা ব্রাহ্মাবধূত (সর্বত্যাগী)।
- ব্রাহ্মাবধূত পরিব্রাজক (গুরুনির্দেশে সাধনা)।
- হংসাবধূত (জীবন্মুক্ত, যেমন রামকৃষ্ণ)।
মৎস্যেন্দ্রনাথের সিদ্ধামৃত মার্গেও অবধূত সংসারত্যাগী। গোরক্ষনাথের সিদ্ধসিদ্ধান্ত পদ্ধতিতে:
শ্রীমৎ পরমাত্মানন্দনাথ ভৈরব গিরি জী তন্ত্রসম্মত সন্ন্যাস গ্রহণ করেন—ব্রাহ্মাবধূত। জুনা আখাড়ার জগদ্গুরু পদে অভিষেক সাতশো বছরের অন্যায়ের প্রতিবিধান।
২০০৫ সালে তাঁর বই (শ্যামা সপর্য্যা বিধি, বগলা সপর্য্যা, দশমহাবিদ্যা তত্ত্ব রহস্য) পড়ে মুগ্ধ। আমার গুরু শক্ত্যানন্দ মহারাজের সাথে পরিচয়, আলোচনা—সবই অদ্বৈতের আলোকে গভীর। ২০১৬-এ মহামণ্ডলেশ্বর, ২০১৭-এ গুরুর মৃত্যু, ২০২৫-এ পুনঃ যোগ। মহারাজের পাণ্ডিত্য অটুট।
উপসংহার:
অদ্বৈত হিন্দু হিসেবে বিশ্বাস করি, সকল দ্বৈততা শেষে একত্বে মিলে যায়—অবধূত তাই মুক্তির প্রতীক। ভৈরব গিরি জীর অভিষেক শাক্তদের জয়। মা চণ্ডীর কৃপায়, তাঁর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা। শেষে দত্তাত্রেয় স্তোত্র:
জয় জগদম্বে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন