ভূমিকা (Introduction)
গরু বা গো(গাভী) শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নয়, সমগ্র বিশ্বের মাতা। এটি অবশ্যই একটি পশু কিন্তু এই পশুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক প্রকৃতির সম্পর্কের মতো। যেভাবে প্রকৃতিকে Mother Nature উপমা দেওয়া হয়। সেভাবেই গো (গাভী) মা উপমায় ভূষিত।
এই গো বেদী পৃথিবীর একটি মূর্ত প্রকাশ, যা মানুষকে অহিংসা, দান এবং প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের শিক্ষা দেয়। যদি বলা হয়, ইশ্বর কোথায়? তবে গরু সেই প্রকট ঈশ্বর। এই বিষয়েই আপনি আজ জানবেন। এই লেখায় আমি শাস্ত্র, পুরাণ, উপনিষদ এবং বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করবো—হিন্দু ধর্মে গরুর প্রকৃত অবস্থান কী। আমরা দেখবো কেন গরু পবিত্র, কামধেনুর প্রতীকী তাৎপর্য, অহিংসার দর্শন, পশুবলির প্রসঙ্গ এবং ভারতের গো-মাংস রপ্তানির বাস্তবতা। এই আলোচনা শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক নয়, দর্শনের মাধ্যমে এটিকে একটি অদ্বিতীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবো, যাতে পাঠকরা বুঝতে পারেন।
হিন্দু ধর্মে গরুর অবস্থান
গরু পবিত্র পশু এবং মাতৃত্বের প্রতীক। গো হত্যা নিষেধ। এটি একটি পবিত্র এবং সম্মানিত প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত। অদ্বৈত দর্শন অনুসারে, ঈশ্বর হলো অদ্বিতীয় ব্রহ্ম, যা সর্বত্র বিরাজমান। গরু, মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী—সবকিছু সেই ব্রহ্মের প্রকাশ। ঋগ্বেদে (৮.১০১.১৫) গরুকে 'অঘ্ন্যা' বলা হয়েছে, যার অর্থ 'যাকে হত্যা করা যায় না'।
শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্র ভাষ্যে সকল প্রাণীর মধ্যে ব্রহ্মের উপস্থিতি বর্ণিত, এবং গরু এর একটি উদাহরণ। হিন্দু সমাজে গরুকে 'গোমাতা' বলে ডাকা হয়, কারণ এটি মাতৃতুল্য—দুধ দিয়ে পুষ্টি প্রদান করে, গোবর দিয়ে সার এবং জ্বালানি দেয়। এই গরু কেবল ধর্মীয় প্রতীক নয়, বরং সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত ভাবেও পূজনীয়। তাই আধুনিক সময়ে, যখন পরিবেশবাদী আন্দোলন চলছে, গো সেবা ও গো সম্পদ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দীর্ঘকাল রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে মাটির অম্লতা বৃদ্ধি পায়। মাটির প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতা কমে যায়। তাই অর্গানিক ফার্মিং এর দিকে ঝোঁক বাড়ছে। গরুকে সম্মান করা মানে প্রকৃতিকে সম্মান করা, যা পুনরায় ঈশ্বরে সাথে একাত্ম হতে উৎসাহ দেয়।
এছাড়া, হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে গরুর অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে কৃষ্ণের সাথে যুক্ত, শৈবতে শিবের নন্দীর সাথে সম্পর্কিত। বেদের গো কে পৃথিবী, ও সম্পদ রূপে পূজা করা হয়েছে। এটি সমগ্র দেবী দেবতার ধারক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে— বাস্তবে সবকিছু এক। তাই গরুকে পূজা করা হলো বেদ কে সন্মান করা।
গরু কেন পবিত্র?
গরুকে পবিত্র বলে মানা হয় কারণ গরু হলো ভগবানের পবিত্র মুখ নিঃসৃত গীতাজ্ঞানের প্রতীক। ভগবান শ্রী কৃষ্ণ গোয়ালা এবং অর্জুন বাছুর। সেভাবে গোয়ালা বাছুরকে বেঁধে রেখে দুধ দোহন করে। শ্রী কৃষ্ণ গোয়ালা সেজে বেদ রুপ গো থেকে আমাদের জন্য গীতার জ্ঞান দোহন করেছেন। এই অর্থে গো মাতা বেদ মাতার প্রতীক।
পশু হিসেবেও গরু মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ উপকার করে। গরু দুধ প্রদান করে, যা শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের পুষ্টির উৎস। দুগ্ধজাত খাদ্য যেমন ঘি, দই, পনির—এগুলো হিন্দু আচারে অপরিহার্য, যেমন যজ্ঞে ঘি ব্যবহার করা হয়, কৃষিকাজে বলদ গরু হাল চালায়, যা প্রাচীন ভারতে অর্থনীতির ভিত্তি ছিল। গোবর জ্বালানি এবং সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা পরিবেশবান্ধব। গর্ভবতী ঘোড়ার মূত্র থেকে যেমন এলোপ্যাথি ঔষধ তৈরী হয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারের গোমূত্র থেকে ঔষধ তৈরী হয়। গোমূত্র -কে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রধানত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিফাঙ্গাল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য উপকারের জন্য। কিছু গবেষণায় এর সম্ভাব্য উপকার দেখা গেছে, যেমন ব্যাকটেরিয়া-বিরোধী কার্যকারিতা, এমনকি ক্যান্সার বা অন্যান্য গুরুতর রোগের চিকিত্সায় এর আয়ুর্বেদিক ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি প্রধানত ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদ ও ইউনানী চিকিত্সায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে, এবং আধুনিক ওষুধে এর ব্যবহার সীমিত।
এই উপকারিতার কারণেই গরুকে “গোমাতা” বলা হয়। , মাতৃত্ব হলো ব্রহ্মের সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ। মনুস্মৃতিতে (৪.৪৮) গরুর প্রতি সম্মানের নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু এটি ধর্মীয় বিশ্বাস তো বটেই বরং তারথেকে বড় হয়ে এটি সাংস্কৃতিক। আধুনিক বিজ্ঞানও দেখায় যে গরুর দুধে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টি রয়েছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পরিবেশগত দিক থেকে, গরু মাটির উর্বরতা বজায় রাখে। হিন্দু বিশ্বাসী হিসেবে, আমি বলবো যে গরুর পবিত্রতা তার মধ্যে ব্রহ্মের উপস্থিতি থেকে আসে, যা সকল প্রাণীর মধ্যে সমান। তাই গরুকে হত্যা করা মানে সেই ব্রহ্মকে অসম্মান করা।
প্রাচীন ভারতে গরু ছিল সম্পদের প্রতীক। মহাভারতে গরুর গুরুত্ব বর্ণিত। কিন্তু এটি কখনো ঈশ্বরত্বের স্তরে উন্নীত হয়নি। আজকের বিতর্কে, অনেকে গরুকে রাজনৈতিক অস্ত্র করে, কিন্তু দর্শন আমাদের শেখায় যে সত্য অদ্বিতীয়।
পুরাণে কামধেনু ও প্রতীকী ব্যাখ্যা
পুরাণে গরুকে কামধেনু বলা হয়েছে—যার অর্থ 'কামনা পূরণকারী'। মহাভারতে এবং বিষ্ণু পুরাণে কামধেনুকে সমুদ্রমন্থনের ফল হিসেবে বর্ণিত, যা ইন্দ্রের কাছে যায়। কিন্তু এটি কোনো সাধারণ গরু নয়, বরং একটি দিব্য প্রতীক। এটি দানের ধারণাকে বোঝায়—গরু যেমন দুধ, সার দেয়, তেমনি ব্রহ্ম সকলকে দান করে।, কামধেনু হলো মায়ার প্রকাশ, যা জগতের কল্যাণ দেখায়।
শঙ্করাচার্যের উপদেশে, সকল প্রতীক ব্রহ্মের দিকে নির্দেশ করে। তাই গরুও সেই একই ব্রহ্মের প্রকট সত্ত্বা। কামধেনুকে পূজা করা মানে দানের গুণকে পূজা করা, ঈশ্বরত্ব নয়। পুরাণের গল্পগুলো অ্যালেগরিক্যাল, যা গভীর দর্শন লুকিয়ে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, কামধেনু ঋষি বশিষ্ঠের কাছে থেকে রাজা বিশ্বামিত্রের সাথে যুদ্ধ করে, যা দানের শক্তি দেখায়। আজকের সমাজে, এটি পরিবেশ সংরক্ষণের শিক্ষা দেয়।
কৃষ্ণলীলায় গরু ও গো চারণভূমি
শ্রীকৃষ্ণের জীবনে গরু এবং গোচারণভূমির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণকে 'গোপাল' বলা হয়, যিনি গরু চরান। অ্যাডভাইতা দর্শনে, কৃষ্ণ হলেন পরমব্রহ্ম, এবং গরু তার লীলার অংশ। কিন্তু কোথাও গরুকে ঈশ্বর হিসেবে উপাসনা করার নির্দেশ নেই। গরু এখানে প্রকৃতি, সরল জীবন এবং ভক্তির প্রতীক।
কৃষ্ণের গোবর্ধন পূজা গরুর সাথে যুক্ত, যা প্রকৃতির পূজা। গোচারণভূমি গোবর্ধন পর্বত হলো সেই স্থান যেখানে কৃষ্ণ লীলা করেন, যা মানুষকে প্রকৃতির সাথে একাত্মতার শিক্ষা দেয়। আজকের পরিবেশ সংকটে, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় এই লীলা প্রাসঙ্গিক। কারণ, ভগবান শ্রী কৃষ্ণ সমগ্র গোকুলকে গোবর্ধন পর্বত পূজার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
অহিংসা ও গো-হত্যা নিষেধের দর্শন
হিন্দু দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ হলো অহিংসা। অহিংসা হলো সকল প্রাণীর মধ্যে ব্রহ্ম দেখা। মহাভারতে (১২.২৬০.১৭) অহিংসাকে সর্বোচ্চ ধর্ম বলা হয়েছে। কিন্তু অহিংসা সর্বজনীন নিয়ম নয়—শাস্ত্রে যুদ্ধ বা আত্মরক্ষায় হিংসা অনুমোদিত। গো-হত্যাকে নিরুৎসাহিত করা হয় কারণ গরু উপকারী প্রাণী।
বেদ ও শাস্ত্রে পশুবলি প্রসঙ্গ
শাস্ত্রে গো-হত্যাকে অনুচিত বলা হয়েছে, কিন্তু পশুবলির প্রথা রয়েছে। মহিষ বলি তান্ত্রিক আচার, যা শক্তির প্রকাশ। কামাখ্যা মন্দিরে মহিষ বলি প্রচলিত, যা দুর্গাপূজার অংশ। মহিষ মাংসকে প্রসাদ বলে গ্রহণ করা হয় কিছু অঞ্চলে। আগামীতে বলি প্রথার ওপর ব্যান লাগাতে পারে। কারণ একটি বিদেশী কোম্পানির PETA অ্যানিমেল ক্রুয়ালটির আরোপ ইদানিং আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে শুরু করেছে।
ভারত কি গো-মাংস রপ্তানি করে?
না, এটি একটি মিথ্যা রটনা। ভারত গরুর মাংস রপ্তানি করে না, বরং ক্যারাবিফ (মহিষের মাংস) রপ্তানী করে। এটি তথ্যগত সত্য, যা USDA রিপোর্টে নিশ্চিত। এই ভুল ধারণা মিথ্যা প্রচারের ফল। ভারতের সমগ্র বিশ্বে মাংস রপ্তানি করে, সেটি মটন ও ক্যারাবিফ, কিন্তু গো মাংস নয়।
উপসংহার (Conclusion)
হিন্দু ধর্মের গভীরতা এবং বিস্তার এমন যে, এর মধ্যে প্রত্যেক প্রতীক এবং আচার-অনুষ্ঠানের পিছনে একটি দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে। বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সমস্ত সৃষ্টি এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মের প্রকাশ। এখানে কোনো দ্বৈততা নেই—সবকিছু এক, সবকিছু ব্রহ্ম। এই দর্শনের আলোকে গরুকে দেখলে, এটি কেবল পৃথক ঈশ্বর নয়, বরং সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মের একটি প্রতীকী প্রকাশ। তবু, আধুনিক সমাজে হিন্দু ধর্ম নিয়ে আলোচনায় গরুকে ঘিরে বহু ভুল ধারণা এবং বিতর্ক প্রচলিত রয়েছে। এই ধারণা প্রায়শই রাজনৈতিক বা সামাজিক অজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হয়, যা শাস্ত্রের গভীরতা না বুঝে ছড়ানো হয়।
হিন্দু ধর্মে গরু পবিত্র প্রতীক। শাস্ত্র, পুরাণ এবং বাস্তবতা এটি নিশ্চিত করে। হিন্দু ধর্মে গরুকে পবিত্র পশু হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু ঈশ্বর নয়। গরু প্রতীক হিসেবে পূজিত, মাতৃত্ব ও উপকারিতার জন্য। পুরাণ এবং শাস্ত্রে গরুকে 'কামধেনু' (সকল কামনা পূরণকারী) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সবকিছু দানের প্রতীক। উদাহরণস্বরূপ, কৃষ্ণের গল্পে গরুকে দেবতাদের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু এটি পশু হিসেবেই থাকে—এতে দেবতাদের বাস করে বলে কিছু বিশ্বাস আছে, তবে এটি প্রতীকী। অহিংসার নীতি (সকল প্রাণীর প্রতি অহিংসা) থেকে গো-হত্যা নিষিদ্ধ, যা গরুর প্রতি সম্মানের অংশ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন