সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় 'ধুরন্ধর ২' (Dhurandhar 2) নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং সাংবাদিক আরফা খানাম শেরওয়ানির মতো পরিচিত সমালোচকদের কড়া নেগেটিভ রিভিউ দেখার পর অনেকেই হয়তো সিনেমাটি দেখার আগ্রহ হারিয়েছেন। কিন্তু গত কাল আমি ও আমার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজেদের চোখেই সিনেমাটির দেখে আসি। আর সত্যি বলতে কী, প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে মনে হলো— আমাদের এই সিদ্ধান্তটা একেবারেই ভুল ছিল না!
কাস্টিং এবং টানটান স্টোরিলাইন
সিনেমাটির প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়বে, তা হলো এর অনবদ্য কাস্টিং এবং শক্তিশালী স্টোরিলাইন। প্রতিটি চরিত্রের জন্য একেবারে মানানসই অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁদের সাবলীল ও দুর্দান্ত অভিনয় গল্পের সাথে দর্শকদের একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বোর হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। মনে হচ্ছিল বাস্তব জীবনের ভিলেন সিনেমায় অভিনয় করছে।
কাল্পনিক হলেও বাস্তবের প্রতিচ্ছবি
ফিল্মের শুরুতেই বলা হয়েছে এটি একটি কাল্পনিক কাহিনী, কিন্তু সিনেমাটি দেখতে বসে বারবার মনে হবে যেন আমাদের চারপাশের চেনা বাস্তব ঘটনাগুলোই পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চরিত্র এবং ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট এতটাই নিখুঁত যে, সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবের সাথে এর হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এটি স্রেফ একটি মশলাদার সিনেমা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই ভাবিয়ে তোলার মতো একটি গল্প। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন রণবীর সিং। এই চরিত্রটি একটি কাল্পনিক চরিত্র এবং এর সঙ্গে বাস্তবের সরাসরী কোনো যোগ নেই।
পাকিস্তানি স্পাইয়ের এক নতুন উপস্থাপন
'ধুরন্ধর ২'-এর যে বিষয়টা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো পাকিস্থানে একজন ভারতীয় স্পাইয়ের নেটওয়ার্ক ও কর্মকাণ্ডের উপস্থাপন। এর আগে বলিউডে বা ভারতীয় সিনেমায় আমরা অনেক স্পাই থ্রিলার দেখেছি, কিন্তু এখানে গুপ্তচরবৃত্তির যে ধরন এবং গভীরতা দেখানো হয়েছে, তা এককথায় অভাবনীয়। ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বাস্তবসম্মত স্পাইয়ের কাহিনী এর আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এটি পুরো সিনেমাটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। কোনো রোমান্টিক গান বা অশ্লীল আইটেম song নেই। একবারে সোজা সাপটা একশন থ্রিলার। ফ্ল্যাশ ব্যাক কাহিনীর ব্লেন্ডিং এমন সুন্দর ভাবে গুছিয়ে দেখানো হয়েছে যেন, মনেই হয় না এটি কোনো বোরিং গল্প। পরতে পরতে আপনার মনকে আঁকড়ে ধরে থাকে। এক কথায় অসাধারণ!
ধুরন্ধর ১-এর পর পাকিস্তানি নেতা নাবিল গাবোল বুক বাজিয়ে বলেছিলেন, পর্দার 'জামিল জামালি' চরিত্রটি তাকে নিয়েই তৈরি। সস্তা পাবলিসিটির লোভে তিনি সর্বত্র এই প্রচার করে বেরিয়েছেন। কিন্তু 'ধুরন্ধর ২'-এ জামালির পরিণতি দেখার পর ভদ্রলোক একেবারে চুপ! অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আইএসআই হয়তো তাকেই তুলে নিয়ে জেরা করছে ইন্ডিয়ান স্পাইয়ের সাথে হাত মেলানোর সন্দেহে!
এটি প্রোপাগান্ডা নাকি স্রেফ দেশপ্রেম?
প্রোপাগান্ডা কথার অর্থ হলো প্রচারমূলক কাজ। প্রোপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য থাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অ্যাজেন্ডা বা মতাদর্শকে জোর করে দর্শকদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া। কিন্তু 'ধুরন্ধর ২' দেখে আমার অন্তত একবারও তা মনে হয়নি।
সিনেমায় স্পষ্টতই একজন RA&W এজেন্টের দেশের সুরক্ষার জন্য লড়াই দেখানো হয়েছে। লস্কর-ই-তৈবা বা আইসিস (ISIS)-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করাটা কোনোভাবেই 'প্রোপাগান্ডা' হতে পারে না, এটি স্রেফ দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন এবং দেশপ্রেম।
সত্যি বলতে কী, কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই যারা এই ফিল্মকে 'প্রোপাগান্ডা' বলে নাক সিটকাচ্ছে, তারা হয় নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শে অন্ধ, নতুবা তারা দেশের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আধুনিক যুগের মীরজাফর। দেশের শত্রুদের, বিশেষ করে লস্কর বা আইসিসের মতো জঙ্গিদের নিকেশ করা দেখে যাদের গায়ে জ্বালা ধরে, তাদের আসল উদ্দেশ্য নিয়েই এখন প্রশ্ন তোলা উচিত!
সমালোচক ও বিরোধীদের এত 'জ্বলছে' কেন?
সিনেমায় কোনো 'হিন্দু-মুসলিম' বিভেদ বা 'বিজেপি ন্যারেটিভ' না থাকার পরও কিছু ইউটিউবার এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের যে গাত্রদাহ শুরু হয়েছে, তার পেছনের কারণগুলো বেশ হাস্যকর:
- হাইপার-ন্যাশনালিজমের জুজু: আজকাল কিছু সমালোচক মনে করেন, সিনেমায় জাতীয়তাবাদ বা পাকিস্তানকে ভিলেন হিসেবে দেখালেই তা বর্তমান সরকারের ' হিন্দুত্ববাদী ন্যাশনালিজম' ন্যারেটিভকে সুবিধা করে দেয়। কিন্তু এই সিনেমায় তেমন কিছুই ছিলো না। দেশের শত্রুর বিনাশ দেখলেই জার্মানের ধ্রুব ও আরফার মতো সাংবাদিক রাজনৈতিক জুজু দেখতে শুরু করেন।
- অহেতুক পলিটিক্যাল কারেক্টনেস: আই.সিস বা লস্করের মতো কট্টর জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ এলেই এক শ্রেণির সমালোচক ভয় পান যে এটি হয়তো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরছে। অথচ এই সিনেমায় জঙ্গিদের ধর্ম বা দেশ নয়, বরং তাদের সন্ত্রাসবাদ এবং দেশের প্রতি তাদের হুমকিকেই ফোকাস করা হয়েছে।
- কন্টেন্ট ব্যবসার কৌশল: মূলধারার জাতীয়তাবাদী বা জনপ্রিয় ন্যারেটিভের কড়া সমালোচনা করাটা অনেক ইউটিউবারের কাছে একটি লাভজনক 'কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজি', কারণ এর মাধ্যমে তারা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট অডিয়েন্স বেস বা ইকো-চেম্বার তৈরি করে ভিউজ বাড়াতে পারেন।
"ঠাকুর ঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি!"
সিনেমায় হয়তো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নামই নেওয়া হয়নি, কিন্তু বিরোধীরা বা সমালোচকরা নিজেরাই ধরে নিচ্ছেন যে এই সিনেমাটি তাদের আদর্শের পরিপন্থী। সিনেমাটি শুধু সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, আর তাতেই যদি কারও গায়ে জ্বালা ধরে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটা সিনেমায় নয়, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ইনসিকিউরিটিতে। হ
শেষ কথা
দিনশেষে শিল্পের মূল্যায়ন সবসময় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে করা উচিত। সমালোচকদের পলিটিক্যাল নেরেটিভ বা ব্যক্তিগত মতামতে প্রভাবিত না হয়ে, একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে থ্রিলার এবং বাস্তবসম্মত গল্পের স্বাদ নিতে চাইলে 'ধুরন্ধর ২' আপনার অবশ্যই দেখা উচিত। রণবীর সিংয়ের ক্যারিয়ার-সেরা অভিনয়, আর আদিত্য ধরের দুর্দান্ত ডিরেকশন—সব মিলিয়েই ছবিটি বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন