আমরা সমগ্র বিশ্বে Gomutrika Technology দিয়েছি। গোমূত্রিকা পদ্ধতি প্রাচীন ভারতীয় গণিতে শাস্ত্রে ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি যা আজ প্রায় সমগ্র বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। আপনি যখন কোনো বড় সংখ্যাকে বড় সংখ্যা দ্বারা গুণ করেন সেই গুণ করার পদ্ধতিতে ডানদিক থেকেএক সংখ্যা সরিয়ে লেখা হয় সেই নিয়মকে-কে গোমূত্রিকা পদ্ধতি বলা হয়।
ব্রহ্মগুপ্ত (Brahmagupta, ৭ম শতাব্দী) তার গ্রন্থ Brahmasphuta Siddhanta-তে এই পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন। এটি তিনি চারটি গুণের পদ্ধতির মধ্যে একটি হিসেবে বর্ণনা করেন (অন্যগুলো: khanda, bheda, ista)। পরবর্তীতে ভাস্করাচার্য (Bhaskaracharya) এবং অন্যান্য গণিতবিদরাও এর উল্লেখ করেছেন। পরে আরব, চীন, এবং ১৪শ শতাব্দীতে গোমূত্রিকা পদ্ধতি ইউরোপে (ইতালি) ছড়িয়ে পড়ে। এটি আধুনিক lattice multiplication বা gelosia method নামে পরিচিত।
ব্রহ্মগুপ্তের 'ব্রাহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত' গ্রন্থের দ্বাদশ অধ্যায়ের (গণিতাধ্যায়) যে শ্লোকটিতে 'গোমূত্রিকা' পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, সেটি হলো ৫৫ নম্বর শ্লোক।
আপনি এর আগের এবং পরের শ্লোক দুটির কথা জানতে চেয়েছেন। গাণিতিক ইতিহাস এবং বিষয়বস্তুর দিক থেকে এই শ্লোক দুটির অবস্থান বেশ চমকপ্রদ। নিচে ৫৪ এবং ৫৬ নম্বর শ্লোক এবং তাদের ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
আগের শ্লোক (দ্বাদশ অধ্যায়, শ্লোক ৫৪)
৫৫ নম্বর শ্লোক থেকে গুণের আলোচনা (প্রত্যুৎপন্ন) শুরু হয়েছে। কিন্তু এর ঠিক আগের শ্লোকটি অর্থাৎ ৫৪ নম্বর শ্লোকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়ের—এটি 'ছায়া-ব্যবহার' (Shadow calculation বা ত্রিকোণমিতিক জ্যামিতি) অংশের শেষ শ্লোক। এতে প্রদীপের আলোয় তৈরি হওয়া ছায়ার সাহায্যে প্রদীপের উচ্চতা মাপার সূত্র দেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃত শ্লোক:
ছায়াগ্রান্তরগুণিতা ছায়া ছায়ান্তরেণ ভক্তা ভূঃ ।ভূঃ শঙ্কুগুণা ছায়াবিভাজিতা দীপশিখয়োচ্চ্যম্ ॥
শ্লোকের অর্থ ও গাণিতিক ব্যাখ্যা:
দুটি শঙ্কুর (Gnomon বা মাপার কাঠি) ছায়ার অগ্রভাগের দূরত্বের গুণফলকে ছায়ার দৈর্ঘ্যের পার্থক্য দিয়ে ভাগ করলে তাদের মধ্যকার ভূমির দূরত্ব পাওয়া যায়। সেই ভূমির মানকে শঙ্কুর উচ্চতা দিয়ে গুণ করে ছায়ার দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করলে প্রদীপের শিখার উচ্চতা নির্ণয় করা যায়। (এটি প্রাচীন ভারতের জ্যামিতিক উচ্চতা ও দূরত্ব মাপার একটি নিখুঁত পদ্ধতি)।
পরের শ্লোক (দ্বাদশ অধ্যায়, শ্লোক ৫৬)
৫৫ নম্বর শ্লোকে 'গোমূত্রিকা' এবং 'খণ্ড' গুণের পদ্ধতির পর, ৫৬ নম্বর শ্লোকে ব্রহ্মগুপ্ত গুণের আরেকটি অসাধারণ পদ্ধতির কথা বলেছেন, যার নাম 'ইষ্ট' (Iṣṭa) পদ্ধতি বা Assumed quantity method।
সংস্কৃত শ্লোক:
গুণ্যো রাশিরিষ্টাধিকোনকেন গুণকরাশিনা গুণ্যঃ ।গুণ্যেষ্টবধোনযুতো গুণকেऽভ্যধিকোনকে কার্যঃ ॥
শ্লোকের অর্থ ও গাণিতিক ব্যাখ্যা:
গুণককে কোনো একটি সুবিধাজনক সংখ্যা (ইষ্ট) দ্বারা বাড়িয়ে বা কমিয়ে গুণ্যকে গুণ করতে হবে। এরপর গুণ্য এবং সেই সুবিধাজনক সংখ্যার গুণফলকে আগের গুণফল থেকে যথাক্রমে বিয়োগ বা যোগ করতে হবে।
সহজ উদাহরণ:
আধুনিক বীজগণিতের বন্টন বিধির (Distributive property) একটি প্রাচীন রূপ হলো এই 'ইষ্ট' পদ্ধতি।
১ ২ ২ ৩
x ২ ৩ ৫
---------------
৬ ১ ১ ৫ (১২২৩ × ৫)
৩ ৬ ৬ ৯ ☓ (১২২৩ × ৩, এক ঘর বাঁদিকে সরানো)
২ ৪ ৪ ৬ X X (১২২৩ × ২, আরও এক ঘর বাঁদিকে সরানো)
----------------
২ ৮ ৭ ৪ ০ ৫ (সবগুলোর যোগফল)
নামকরণের তাৎপর্য:
সংস্কৃত ভাষায় 'গোমূত্রিকা' বলতে বোঝায় গরুর চলার বা মূত্রত্যাগের আঁকাবাঁকা পথ (Trajectory of a cow's urine) । আমরা যখন কাগজে বড় সংখ্যার গুণ করি এবং প্রতি ধাপে একটি করে স্থান (Place value) ছেড়ে দিয়ে নিচে নিচে সংখ্যা বসাই, তখন সেই সংখ্যার সম্পূর্ণ সজ্জাটি দেখতে একটি আঁকাবাঁকা বা জিগজ্যাগ রূপ নেয়। শূন্য (0) এবং স্থানীয় মানের (Place-value system) সঠিক প্রয়োগের ফলেই এই পদ্ধতিটি এত সফল হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে বিস্তার এবং আধুনিক রূপ
এই পদ্ধতিটির বিশ্বব্যাপী বিস্তারের একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ধারা রয়েছে:
- আরব বিশ্বে প্রভাব: অষ্টম এবং নবম শতাব্দীতে খলিফা আল-মনসুরের সময়ে ভারতীয় পণ্ডিতরা বাগদাদে যান। তখন আল-খাওয়ারিজমির মতো পারস্য গণিতবিদরা ব্রহ্মগুপ্তের গ্রন্থগুলোর চর্চা এবং আরবি অনুবাদ করেন। এর মাধ্যমে ভারতীয় এই গাণিতিক কৌশল আরবদের হস্তগত হয়।
- ইউরোপে প্রবেশ: আরব বণিক এবং পণ্ডিতদের হাত ধরে, এবং পরবর্তীতে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ফিবোনাচ্চি (Fibonacci)-এর মতো গণিতবিদদের মাধ্যমে এই পদ্ধতি ইতালিসহ সমগ্র ইউরোপে পৌঁছায়।
- ল্যাটিস বা জেলোসিয়া (Gelosia) পদ্ধতি: চতুর্দশ শতাব্দীর ইতালিতে এটি 'জেলোসিয়া' পদ্ধতি নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। জেলোসিয়া হলো জানালার জালের মতো একটি ছক, যেখানে গুণফলগুলো বসানো হতো। এটি মূলত ভারতীয় পদ্ধতিটিরই একটি ছকবদ্ধ এবং পরিমার্জিত রূপ।
ব্রহ্মগুপ্ত (Brahmagupta, আনুমানিক ৫৯৮–৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন অসাধারণ গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি উজ্জয়িনী (Ujjain)-তে কাজ করতেন, যা তখন বিজ্ঞান-গণিতের একটা প্রধান কেন্দ্র ছিল। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ব্রাহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত (Brāhmasphuṭasiddhānta, ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত) — এটি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটা মাইলফলক। পরবর্তীতে তিনি খণ্ডখাদ্যক (Khaṇḍakhādyaka, ৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ) রচনা করেন।
তার অবদানগুলো গণিতের মৌলিক ধারণাকে বদলে দিয়েছে, যা পরে আরব, ইউরোপীয় গণিতবিদদের কাছে পৌঁছেছে।
পরিশিষ্ঠ :
আজ আমরা সারা বিশ্বের স্কুল-কলেজে যে সাধারণ পদ্ধতিতে গুণ করা শিখি (Standard Long Multiplication), তা সরাসরি এই প্রাচীন গোমূত্রিকা পদ্ধতিরই আধুনিক এবং সর্বজনীন রূপ। আমরা সমগ্র বিশ্বে Gomutrika Technology দিয়েছি। গোমূত্রিকা পদ্ধতি প্রাচীন ভারতীয় গণিতে শাস্ত্রে ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি যা আজ প্রায় সমগ্র বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু কোনো দেশ , আমাদের দেশেও এর বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় না।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন