মাটনের বদলে বিফ পরিবেশনের অভিযোগে বিতর্কে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী অলিপাব


কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের ঠিকানা অলিপাব (Olypub) সম্প্রতি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বাংলা টেলিভিশন অভিনেতা ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তীর অভিযোগ, তাঁকে মাটনের পরিবর্তে বিফ স্টেক পরিবেশন করা হয়েছে এই রেস্তোরাঁয়।

ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি। সায়ক চক্রবর্তীর দাবি, ওই দিন তিনি তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে অলিপাবে নৈশভোজে যান এবং একটি মাটন স্টেক অর্ডার করেন। কিছুক্ষণ পর এক প্লেট খাবার টেবিলে পরিবেশন করা হয়, কিন্তু সেটি কী পদ—সে বিষয়ে ওয়েটার কোনও স্পষ্ট তথ্য দেননি। তিনি ও তার বন্ধুরা সেই খাবার খেয়ে নেন। পরে ওয়েটার আবার একটি নতুন প্লেট এনে বলেন, “এইটা আপনার মাটন স্টেক।” তখনই সায়ক আগের পরিবেশিত খাবার সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তখন ওয়েটার জানান যে প্রথমে পরিবেশিত পদটি ছিল বিফ স্টেক।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সায়ক চক্রবর্তী পুরো ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে সম্প্রচার করেন। তাঁর ‘Sayak’ নামের ফেসবুক পেজে যেখানে প্রায় ১৪ লক্ষ ফলোয়ার রয়েছে। অবশ্য ৩ মিনিট পর তিনি ভিডিওটি ডিলিট করে ফেলেন, কিন্তু ততক্ষনে তা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওতে দেখা যায়, সায়ক চক্রবর্তী ওয়েটারের সঙ্গে উচ্চস্বরে তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, মাটনের অর্ডারের বদলে কীভাবে বিফ পরিবেশন করা হতে পারে এবং জানান যে তিনি ব্রাহ্মণ। ভিডিওতে তাঁকে ওয়েটারের ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতেও শোনা যায়। ওয়েটার নাসিমুদ্দিন শেখ জানান তিনি মুসলিম। এরপর সায়ক শুয়োরের মাংস খাওয়ানোর প্রসঙ্গ তুলে তুলনা করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজিত করে তোলে।

ভিডিওতে অলিপাবের এক প্রতিনিধি (সম্ভবত  ম্যানেজার) পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং ওয়েটারকে মৌখিকভাবে ভর্ৎসনা করেন। অভিযুক্ত ওয়েটার একাধিকবার ক্ষমা চান এবং ঘটনাটিকে তার  নিজের ‘ভুল’ বলে স্বীকার করেনেন। তিনি ভবিষ্যতে এমন গাফিলতি হবে না বলেও আশ্বাস দেন। তবে সায়ক চক্রবর্তী ও তাঁর সঙ্গে থাকা এক মহিলা সঙ্গী ক্ষমাপ্রার্থনা গ্রহণ করতে রাজি হননি।

ঘটনার আরেকটি দিক নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সায়ক চক্রবর্তীর দাবি, তাঁরা শুধুমাত্র একটি মাটন স্টেক অর্ডার করেছিলেন। অন্যদিকে, ওয়েটার প্রথমে জানান যে দুটি স্টেক অর্ডার করা হয়েছিল—একটি মাটন ও একটি বিফ। পরে চাপের মুখে তিনি সেই দাবি আর পুনরাবৃত্তি না করে ক্ষমা চান। আদৌ অর্ডার নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল নাকি রেস্তোরাঁর তরফে ভুল পরিবেশন করা হয়েছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এই ঘটনার পর অলিপাব ও সায়ক চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে-পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। খাদ্য পরিবেশনের দায়িত্ব, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং একজন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারের আচরণ—এই সমস্ত বিষয় ঘিরেই চলছে বিতর্ক।

আসলে দোষ কার?

এই ঘটনার বিচার করতে গেলে আবেগ নয়, যুক্তি ও দায়িত্ববোধকে সামনে রাখতে হয়। প্রথমেই বলতে হয়, ভুল খাবার পরিবেশন হওয়া রেস্তোরাঁর একটি গুরুতর ব্যর্থতা। 

খাবারের ক্ষেত্রে কী পরিবেশন করা হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো রেস্তোরাঁর মৌলিক দায়িত্ব—বিশেষ করে মাটন ও বিফের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে। অর্ডার নেওয়া, কিচেন থেকে খাবার পাঠানো এবং টেবিলে পরিবেশন—এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সিস্টেমের মাধ্যমে চলে। 

সেখানে যদি ভুল হয়, তা ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। এই দায়িত্ব থেকে রেস্তোরাঁ কোনওভাবেই মুক্তি পেতে পারে না।

ওয়েটার একজন সাধারণ কর্মচারী, যিনি রেস্তোরাঁর নির্দেশ ও সিস্টেমের মধ্যেই কাজ করেন। তিনি ভুল করে থাকতে পারেন, কিন্তু সেটি মানবিক ভুল। তিনি বারবার ক্ষমা চেয়েছেন এবং ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত বলেই মেনে নিয়েছেন। একজন ক্ষমতাহীন কর্মচারীকে ‘অপরাধী’ বানিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়, বরং তা অন্যায়েরই একটি রূপ।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে ইনফ্লুয়েন্সারের প্রতিক্রিয়ায়। ধরেই নেওয়া যাক তাঁর সঙ্গে সত্যিই বড় ভুল হয়েছে এবং তিনি ধর্মীয়ভাবে আঘাত পেয়েছেন—তা সত্ত্বেও তাঁর প্রতিক্রিয়া সংযত ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। তাঁর ওই রেস্তরায় যাওয়াই উচিৎ ছিল না কারণ, সেখানে তার অরুচিকর খাদ্য রান্না হয়। 

যদিও তাঁর Facebook ও সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ছবি দেখে মনে হয় সায়ক চক্রবর্তী একজন সেক্যুলার হিন্দু ছিলেন। ঈদে মুসলিম টুপি পরে সে ঈদ উৎযাপন করেছে। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, সে কোনো কট্টর হিন্দু সমর্থক নয়। 

কিন্তু লাইভ ভিডিও করে একজন কর্মচারীকে জনসমক্ষে অপমান করা, তার ধর্ম জানতে চাওয়া, নিজের জাতিগত পরিচয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এবং ক্ষমা চাওয়ার পরেও উত্তেজনা বাড়ানো—এই সবকিছু ঘটনাটিকে একটি পেশাগত ভুল থেকে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়। এখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার প্রদর্শনই বেশি চোখে পড়ে।

একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে যখন বিপুল জনসমর্থন ও প্ল্যাটফর্ম থাকে, তখন তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তিনি চাইলে বিষয়টি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সমাধান করতে পারতেন, আইনি পথে যেতে পারতেন বা অন্তত এমনভাবে প্রতিবাদ জানাতে পারতেন যাতে কোনও ব্যক্তির সম্মান ও পরিচয় আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। সেই সংযম ও পরিণতিবোধের অভাবই এই ঘটনাকে এত বড় ও বিষাক্ত করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ঘটনা ঘটার জন্য মূল দায় রেস্তোরাঁর, কিন্তু ঘটনাটিকে যেভাবে উত্তেজিত, অপমানজনক ও বিভাজনমূলক রূপ দেওয়া হয়েছে, তার নৈতিক দায় সবচেয়ে বেশি ইনফ্লুয়েন্সারের। ভুল খাবার পরিবেশন হওয়া একটি পেশাগত ব্যর্থতা, কিন্তু সেই ভুলকে ধর্ম ও পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত করা চরিত্র ও দায়িত্ববোধের ব্যর্থতা।

অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া

অনেকে ওই ইনফ্লুয়েনসারের বিরুদ্ধে দাঙ্গা লাগানোর অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হচ্ছে। এটা অত্যন্ত বাড়াবাড়ি। কারণ, যারা এই মিছিল বের করছে, তাদের যুক্তি খুবই বায়াস। তারা জেনে বুঝেই জিনিসটিকে সম্প্রদায়িক ঝামেলার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে না তো?

ফেসবুক স্ক্রিনশট

প্রথমে পরিষ্কার করে বলা দরকার, এই ঘটনাকে “দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা” বা “ধর্মীয় উস্কানি” বলা আইনগত ও বাস্তব—দু’দিক থেকেই অত্যন্ত বড় অভিযোগ। দাঙ্গা বা দাঙ্গায় উসকানি বলতে বোঝায়—ইচ্ছাকৃতভাবে, সংগঠিতভাবে, হিংসার আহ্বান জানানো বা মানুষকে সরাসরি আক্রমণে নামতে প্ররোচিত করা। এই ঘটনায় যতটা দেখা যাচ্ছে, ইনফ্লুয়েন্সারের বক্তব্য নিঃসন্দেহে আপত্তিকর, অসংযত এবং সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিতপূর্ণ। কিন্তু তা হলেও, তা সরাসরি হিংসার ডাক বা দাঙ্গার আহ্বান—এই স্তরে পৌঁছয়নি। 

 “দাঙ্গা” শব্দটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা আবেগপ্রবণতার প্রতিক্রিয়াকে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে বলে বেশি বলে মনে হয়।

এবার যারা বিক্ষোভ মিছিল করছে, তাদের যুক্তির দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট বায়াস চোখে পড়ে। তারা পুরো ঘটনাটিকে একটি প্রশাসনিক ও পেশাগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে, একেবারে শুরু থেকেই সম্প্রদায়িক ফ্রেমে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ইনফ্লুয়েন্সারের ভুল আচরণের সমালোচনা না করে, তারা ঘটনাটিকে “একটি সম্প্রদায়কে আক্রমণ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এতে বাস্তব সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং সংঘাতের পরিসর আরও বড় হয়।

ইনফ্লুয়েন্সার ধর্মের প্রশ্ন টেনে যে কাজটি করেছেন—তা নিঃসন্দেহে সমালোচনাযোগ্য। কিন্তু সেই ভুলের জবাবে আবার অন্য পক্ষ যদি মিছিল, স্লোগান, ‘দাঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে, তাহলে তারা নিজেরাই সেই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে আরও শক্তিশালী করে দিচ্ছে। অর্থাৎ, সমস্যার বিরুদ্ধে নয়—সমস্যার ভাষাতেই তারা কথা বলছে।


গতকাল সায়ক চক্রবর্তী  Facebook এ স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন:

রাগের মাথায় থানায় গেছিলাম, ঠিক। এই ভুলে অলি পাবের ক্যাসুয়াল অ্যাপ্রোচে আমার মাথার ঠিক ছিলো না । আমি বিফ কোনোদিনও মুখে তুলিনি । এবার থেকে দেখে শুনে বুঝে চলব না হয় । আমি জনগণের উপর নির্ভরশীল, তাই জনগণ যা বলবেন সেটাই ঠিক , হয়ত ওই ভদ্রলোক আর অলি পাবের বিরুদ্ধে আমি কমপ্লেন উইথড্র করছি ।

আমার অলি পাবের ভুল নিয়ে সমস্যা ছিলো। হতে পারে আমার রিঅ্যাকশনও ভুল ছিলো । আমি দুঃখিত ভবিষ্যতে ভ্লগ বানানোর ক্ষেত্রে আমি এই ধরণের কন্ট্রোভার্সিতে জড়াতে চাই না । 

আমার হিন্দু মুসলিমের সমস্যা নেই। আমি নিজের কিছু আচার মেনটেইন করতে চাই শুধু। আমার ভ্লগ আর কিছু ইনস্টগ্রাম কনটেন্ট সবাইকে এক হয়ে থাকার কথা আগেও বলত, পরেও বলবে অনিচ্ছাকৃত ঘটনার জন্য আবারও দুঃখিত ।

  • এই পর্যায়ে এসে ওইসব থিওরি অযৌক্তিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হয়। কারণ—প্রতিষ্ঠান ক্ষমা চেয়েছে
  • অভিযোগকারী অভিযোগ তুলে নিয়েছে
  • দু’পক্ষই অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বীকার করেছে। 

এখনও যদি কেউ ঘটনাটাকে জোর করে সাম্প্রদায়িক বা ষড়যন্ত্রের রঙ দেয়, তাহলে ধরে নিতে হয়—তারা সমাধান নয়, সংঘাত চায়। তারা ঘটনার বিচার করছে না, নিজেদের রাজনৈতিক/আইডিওলজিকাল চশমা দিয়ে গল্প বানাচ্ছে।


উপসংহার:

আরও একটা বিষয় খেয়াল করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের মিছিল বা প্রতিবাদে ন্যায়বিচারের চেয়ে পরিচয়-রাজনীতি বেশি কাজ করে। উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়—“আমাদের পক্ষ বনাম ওদের পক্ষ”। এতে ঘটনাটির নিরপেক্ষ বিচার অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়—কে আসলে দোষী, আর কে পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে বোঝা মুশকিল হয়ে যায়। 

সবশেষে বলা যায়, ইনফ্লুয়েন্সারের আচরণ ভুল ও নিন্দনীয়, কিন্তু তার জন্য “দাঙ্গা লাগানোর অভিযোগ” তুলে রাস্তায় নামা একটি অতিরঞ্জিত ও বায়াসড প্রতিক্রিয়া। এই ধরনের প্রতিবাদ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না, বরং ঘটনাটিকে আরও সাম্প্রদায়িক রঙ দেয়। বাস্তব সমাধান আসে সংযম, আইনি প্রক্রিয়া ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনা থেকে—মিছিল আর উত্তেজনা থেকে নয়।


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Advertisement