এপস্টাইন ফাইলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম: সত্যতা কি?


 ✍️ এই প্রতিবেদন কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থনে বা বিরুদ্ধে নয়। এই প্রতিবেদন এপস্টাইন ফাইলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামের অপবাদের বিরুদ্ধে একটি বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা। 

Epstein Files

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায়বিচার বিভাগ (U.S. Department of Justice) Jeffrey Epstein-সম্পর্কিত নথিপত্র প্রকাশ করেছে, যাকে অধিবক্তারা ও সংবাদমাধ্যমে “Epstein Files” নামে উল্লেখ করছেন। এই নথিগুলোর একটি অংশে বিভিন্ন ইমেইল, ছবি, তথ্য ও রেফারেন্স রয়েছে যা বিভিন্ন ব্যক্তি বা ঘটনাকে উল্লেখ করেছে। 

প্রশ্ন : এপস্টাইন ফাইলে কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম আছে?

নকল ছবি


উত্তর : আছে। তবে, এইটা অর্ধসত্য। কারণ— রাহুল গান্ধী, শচিন তেন্ডুলকার, লিওনেল মেসি, ডেভিড বেকহ্যাম, মাইকেল জর্ডান - এদেরও নাম আছে। এই ফাইলে শুধু নাম থাকার জন্যে কাউকে অ্যাকিউজ করাটা কতটা যুক্তিগত সেটা ভেবে সেখতে হবে? কিন্তু প্রশ্ন হলো,

মোদীর নাম কী প্রসঙ্গে আছে? 

২০১৭ তারিখের এপস্টাইনের একটি ইমেলে লেখা আছে:

"The Indian Prime Minister Modi took advice and danced and sang in Israel for the benefit of the US president. They had met a few weeks ago. IT WORKED!" 

শুধু এইটুকুই। কোনো অপরাধজনিত কারণে মোদীর নাম জড়ায়নি, কোনো ছবি বা ভিডিও দেখা যায়নি। উদ্ধৃতিটি অনেক সোশাল মিডিয়া ফোরামে ও অনলাইন আলোচনায় দেখা গেছে, কিন্তু এটি সরকারি কোনো প্রামাণিক নথি বা স্বয়ং ন্যায়বিচার বিভাগের প্রকাশিত বিবৃতি নয়।

কিন্তু, Copy-Paste  University থেকে স্নাতক বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধুজীবীরা নিজেদের Fake Narrative প্রচার করছে।

আসল ছবি

এখানে মোদী danced and sang - এর অর্থ?

এর অর্থ বুঝতে হলে ইংরাজি idiom বা প্রবাদ বাক্য বুজতে হবে। যেমন "break the ice" - এর অর্থ কি বরফ ভাঙ্গা? না এর অর্থ হলো "অস্বস্তি ভাঙা" বা গম্ভীর পরিবেশ হালকা করা। Beat about the bush - এর মানে কি ঝোপের চারিদিকে ঘোরা? নিশ্চয়ই নয়। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলা বা সোজাসুজি কথায় না যাওয়া। তেমনি Danced and sang এখানে একটি ইডিওমেটিক phrase, সেইভাবেই এর অর্থ "নাচ গান করা" নয়। এর অর্থ হলো —“রাজনৈতিকভাবে খুশি রাখার চেষ্টা করা” বা “কারো মন জয় করার জন্য অভিনয়/gesture করা”। বাংলা ভাষায় যাকে আমরা বলি “তেল দেওয়া”

কারণ, মোদী আমেরিকায় গিয়ে Indian আমেরিকন যাদের NRI বলা হয়, তাদের ট্রামপের জন্য সমর্থন করেছিলেন বলে মনে করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই idiomatic phrase হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে । হলেও তো সেইটাও মোদীর অপমান করাই হয়েছে। এক কথায় মোদীকে ট্রাম্পের চাপলুস বলেছে এপস্টাইন।

মোদী কি ট্রাম্পের চাপলুসি করে চলেন? 

মোদী কোনোদিনই আমেরিকার চাপলুসি করেন নি। করোনার সময় আমেরিকার ভ্যাকসিন ভারতের বাজারে ঢুকতে দেন নি, দেশবাসীকে ফ্রিতে ভ্যাকসিন দিয়েছেন। ট্রাম্প বারবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন, যে মোদী তাকে খুশি করতে পারছেন না। এজন্যে ভারতের পণ্যের উপর শুল্ক বসিয়েছেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ট্রাম্প বাবাজির কাছে মাথা নত করেননি। এটা "জিও পোলেটিক্স"  — এখানে কেউ কারো বন্ধু নয়। 

ট্রাম্প বারবার ভারত পাক সংঘর্ষের মিডিয়েট করার দাবি করেছেন, ভারত সরকার প্রেস রিলিজ করে সেই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। অন্ধ সমালোচক নিজেদের শিক্ষিত দাবি করলেই তারা শিক্ষিত না, তারা অশিক্ষিতই থাকবে। তেমনি। কেউ দাবি করলেই সেইটা সত্য হয়ে যায় না। Copy-Paste  University থেকে স্নাতক বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধুজীবী দের একটি মিথ্যা রটনা মাত্র।

ভারত সরকার কিছু বলছে না কেন?

 ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রকপ্রেস রিলিজ করে এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ , মিনিস্ট্রি অফ এক্সটারনাল এফেয়ার্সের , গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার, প্রেস রিলিজের বিবৃতি:

"We have seen reports of an email message from the so-called Epstein files that has a reference to the Prime Minister and his visit to Israel. Beyond the fact of the Prime Minister’s official visit to Israel in July 2017, the rest of the allusions in the email are little more than trashy ruminations by a convicted criminal, which deserve to be dismissed with the utmost contempt." 

অতএব , নরেন্দ্র মোদীর নাম কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়ায়নি। 

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং ইয়াসিন মালিকের সাথে ছবি তুলেছিলেন সেই UPA সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে তখন বামেরা। সেই ইয়াসিন মালিকের সাথে অরুন্ধতী রায়ের ছবিও আছে। যা বার বার প্রমাণ করে, এদের আসল উদ্দেশ্যটা কি।

বামেদের  নিউইয়র্কের জোহরান মেয়র মামদানির মা মীরা নায়ারের নাম এই ফাইলে আছে। এই মহিলাকে ২০১২ সালে কংগ্রেস সরকার ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ  সম্মান " পদ্মভূষণ"  দিয়ে সম্মানিত করেছিল। মীরা নায়ারের নাম নিয়ে এদের কাউকে কিছু বলতে শুনেছেন কেন? শুনবেন কীভাবে? ভাসুরের নাম কি নষ্টা মুখে আনে? 🤣

একনায়কতান্ত্রিক ও একদলীয় শাসনব্যবস্থার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—শাসকের জীবদ্দশায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রকাশ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে, শাসকের মৃত্যু বা ক্ষমতাচ্যুতির পরই নথিভুক্ত তথ্য, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং স্মৃতিকথার মাধ্যমে বহু গোপন ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে, জোসেফ স্তালিনের শাসনামলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ল্যাভরেন্তি বেরিয়া কার্যত অপ্রশ্নিত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। স্তালিন জীবিত থাকাকালীন বেরিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে আসেনি। তবে স্তালিনের মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্বের অধীনে বেরিয়া গ্রেপ্তার হন এবং বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে নারীদের ওপর নির্যাতনসহ একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণায় উঠে আসে।

চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসেও অনুরূপ চিত্র লক্ষ্য করা যায়। ড. লি ঝিসুই রচিত The Private Life of Chairman Mao গ্রন্থটি মাও সেতুং-এর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের স্মৃতিকথা। বইটিতে মাও-এর ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে। মাও জীবিত থাকাকালীন এই ধরনের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ ছিল না, যা তৎকালীন চীনের কঠোর সেন্সরশিপ ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে।

উত্তর কোরিয়ার কিম পরিবারতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বহু আত্মীয় ও উচ্চপদস্থ পার্টি কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড বা নিখোঁজ করার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পালিয়ে আসা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে এসব বিষয়ে প্রতিবাদ বা মুক্ত আলোচনা কার্যত অনুপস্থিত, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাবকে নির্দেশ করে।

কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে, কমিউনিস্ট পার্টি অফ কাম্পুচিয়ার নেতা সালোত সার, যিনি পল পত নামে পরিচিত, তাঁর শাসনামলে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হন। নারী নির্যাতনসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এই সময়কাল নিয়ে লেখা “First They Killed My Father” গ্রন্থ এবং একই নামের চলচ্চিত্রটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালীন মাও সেতুং-এর চতুর্থ স্ত্রী জিয়াং ছিং-এর ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কেও পরবর্তীকালে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে। অভিনেত্রী সান ওয়েইশির ওপর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাটি বহু বছর গোপন ছিল এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের আলোচনায় আসে।

এই ধরনের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে প্রায়ই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বা মতাদর্শের সমর্থকদের পক্ষ থেকে এগুলোকে “বিদেশি প্রোপাগান্ডা” বলে আখ্যায়িত করা হয়। তবে লক্ষণীয় যে, এসব তথ্যের একটি বড় অংশ এসেছে শাসন পরিবর্তনের পর উন্মুক্ত হওয়া দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং অভ্যন্তরীণ স্মৃতিকথা থেকে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাও মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে মুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯২ সালে ভারতের রাজস্থানের আজমীর শরিফ দরগায় সংঘটিত নাবালিকাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাটি একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে নথিভুক্ত। তবে এ ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো—ঘটনাটি প্রকাশ পেয়েছে, তদন্ত হয়েছে এবং তা নিয়ে আজও গবেষণা ও আলোচনা সম্ভব।

তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে Facebook-এর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ, যা রাষ্ট্রের তথ্যনিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ নীতির বাস্তব উদাহরণ।

এই পর্যালোচনা থেকে একটি সাধারণ উপসংহার টানা যায়—যেসব শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রশ্নাতীত এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, সেখানে সত্য প্রকাশ প্রায়শই বিলম্বিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের পরই সেই সত্য ইতিহাসের নথিভুক্ত অংশে পরিণত হয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Advertisement