বাল্মীকির রামায়ণে রামের জীবন কি নিরামিষ ছিল না

হিন্দুরা রামায়ণ পড়ে না। হিন্দুরা সংস্কৃত ভাষাও  জানে না। তাই হিন্দুদের সংস্কৃত ভাষায় ভালো দখল নেই। হিন্দুদের নিজ ধর্মীয় পরম্পরার কোনো জ্ঞান নেই। গুরু, দেবতা, ইশ্বর, অবতার, ভগবান সব কিছুই গুলিয়ে গ হয়ে গেছে।



তাই এই অজ্ঞানের দুনিয়ায় কিছু লোক বিজ্ঞ সেজে সমাজকে গর্তে ফেলে দেয়। আর কিছু লোক মুনাফা কামিয়ে চলে যায়। হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যে যাই বলে, আমরা দিক বিদিক বিচার না করে তেমনই চলতে থাকি। আবার, যদি কেউ ভূল ব্যখ্যা, মিথ্যা অপবাদ প্রচার করে থাকে। সেটি উপলদ্ধি করেও সেই ভূলকে সুধরে দেয়ার ক্ষমতা আমাদের মধ্যে নেই। অপবাদের সংশোধন করার বদলে তাঁকে গালি গালাজ করি। 

রামায়ণের শ্রী রাম মাংস খেতেন কি না। সেই বিষয়ে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী নামক এক পুরাণ তত্ত্ববিদের যুক্তি ছিলো, মাংস, মদ ক্ষত্রিয়দের খাদ্য।

তাঁর এই যুক্তির যথাযথ বিচার, খন্ডন ও ভ্রান্তির মূল মুন্ডন করে যথাযথ যুক্তির মন্ডন করবো। 

ভূমিকা:

আনন্দ বাজার পত্রিকার একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লেখা হয়েছে। যেখানে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী নামক এক পুরাণ তত্ত্ববিদ লিখেছেন, রামায়ণে শ্রী রাম যেহেতু ক্ষত্রিয় বংশোৎভুত রাজকুমার ছিলেন, তাই তিনি মাংস, মদ ভিক্ষণ করতেন।  তাঁর বক্তব্য অনুসারে "প্রাদেশিক রামায়ণে রামকে ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব ভক্তরা মদ ও মাংসের কাছে যেতে দেয়নি। তাঁরা রাম ও লক্ষ্মণকে কোনো অবস্থাতেই একজন ক্ষত্রিয় রাজপুত্রের স্বাভাবিক খাদ্য খেতে দেননি। এরপর তিনি রামায়ণ থেকে বহু উধৃতী দিয়েছন। যেখানে রামকে মাংস খেতে দেখা গেছে। তাই আমাদের জানতে হবে, 

ম*দ ও মাংস ভক্ষণ কি বেদ বৈধ?

মদ ও মাংস ভক্ষণ একেবারেই অন্যায় বা নিষিদ্ধ নয়। তবে পশুর মাংস ভক্ষণকে হিন্দু শাস্ত্র খোলামেলা বৈধতাও দেয় না। মাংস শব্দেটি আমরা পশুর মাংস হিসেবেই গণ্য করি। কিন্তু ফলের শাশ বা mesocarp কেও মাংস বলা হয়। 

যেহেতু পশুর মাংস পশুর হত্যার পর পরই প্রাপ্ত হয়। তাই উদর পূর্তির জন্য এই মাংস আহার বেদে নিষিদ্ধ বলেই গণ্য করা হয়েছে। মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ট ও বুদ্ধিমান প্রাণী তাই বলে সে তাঁর থেকে কম বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণীর জীবন হনন করে নিজের পেট ভরার অধিকার পেয়ে যায় না। কিন্তু যারা আগে থেকেই মাংস খেয়ে আসছেন। তাঁদের জন্যও আমাদের ঋষিরা নিয়ম করে দিয়েছেন। 

মাংস খাওয়ার খুব খুব প্রয়োজন হলে তবেই গ্রহন করা উচিত। যেমন আকাল, খাদ্যাভাব, জীবন সংশয় এরকম পরিস্থিতিতে শিকার করে মাংস ভক্ষণ অনুচিত নয়। 

ঋষি প্রদত্ত পরম্পরার তান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী পশুকে আগে ঈশ্বরের নিমিত্তে বলি দিতে হবে এবং ওই পশু যাতে সদ গতি প্রাপ্ত হয়, সেই প্রার্থণা করতে হবে। পশুর মাংস খাওয়াটা পশু বলির উদ্দেশ্য নয়। পশুকে পাশ বন্ধন থেকে মুক্ত করে সদ গতি প্রাপ্ত হাওয়া, এবং সাধকের আধ্যাত্মিক ফল লাভ করাই এর মুখ্য কারণ। কারণ, মা কালী রসনা প্রিয় হলেও জিহ্বা কর্তন করে সাধককে রসনা নিবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

যোগ সাধকের মাংস হলো মৌনতা।

বিঃদ্রঃ : শৈব, বৈষ্ণব, ব্রাহ্মণ এবং যারা আধ্যাত্বিক পথে চলেছেন তাঁদের ক্ষেত্রে মাংস ভক্ষণ সর্বদা অনুচিত। শৈব, বৈষ্ণব, ব্রাহ্মণদের জন্য বলি হিসেবে ফল, সবজি ও তদ মাংস 

তন্ত্র মতে বৈদিক যুগে বহু ক্ষেত্রে মানুষ বিধি সংস্কার দ্বারা অভিষিক্ত ম*দ পান করতো।  ম*দের নেশায় ডুবে মাতাল হাওয়ার শিক্ষা তন্ত্র বা কোনো ঋষিই দেয়নি। ম*দ ও তামসিক খাদ্য করতো সেই সময়ের সপচ ও চণ্ডালরা। তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্ম চেতনা ও ধর্মীয় সংস্কার জাগিয়ে তোলার জন্য অভিষিক্ত ম*দ খাওয়ার মনঃতাত্ত্বিক কারণ ছিলো। 

যোগ সাধকের মদ হলো খেচুড়ি মুদ্রার দ্বারা তালু থেকে নির্গত হওয়া অমৃত পান করা।

তাই, এই মাংস এবং মদ নিয়ে শ্রী রামের খাদ্যাভাস জাস্টিফাই করার আগে আমাদের সেই বিষয়ে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। রামায়ণে বাল্মিকী কি সত্যিই রামকে মাংস ভক্ষণ করিয়েছেন। 

রামচন্দ্র কি মা সীতাকে মাংস খাওয়ার জন্য প্রলোভিত করছিলেন?

নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী ABP bangla র সেই প্রতিবেদনে লিখেছেন, চিত্রকূট পাহাড়ের এক জায়গায় বসে মন্দাকিনীর তরঙ্গশোভা দেখাতে দেখাতে রামচন্দ্র সীতাকে হরিণের মাংস খাওয়ার জন্য প্রলোভিত করে তুলতে চাইছিলেন, — সীতাং মাংসেন ছন্দয়ন্। তাঁর এইবক্তটি তিনি এই শ্লোক থেকে নিয়েছেন। 

तां तदा दर्शयित्वा तु मैथिलीं गिरिनिम्रगाम्। 
निषसाद गिरिप्रस्थे सीतां मांसेन छन्दयन् ॥ १ ॥

तां (tāṁ) - তাঁকে (সীতাকে) तदा (tadā) - তখন, दर्शयित्वा (darśayitvā) - দেখলেন,  तु (tu) - কিন্তু मैथिलीं (maithilīṁ) - মিথিলার কন্যাকে गिरिनिम्रगाम् (girinimragām) - পাহাড়ী হরিণ, निषसाद (niṣasāda) - নিষাদ নামক পর্বত, गिरिप्रस्थे (giriprasthe) - পাহাড়ের ঢালাইয়ের ওপর, सीतां (sītāṁ) - সীতাকে, मांसेन (māṁsena) - মাংস দ্বারা,  छन्दयन् (chandayan) - সন্তুষ্ট করলেন।

প্রথম পংক্তিতে হরিণের কথা বলা হয়েছে। "दर्शयित्वा तु मैथिलीं गिरिनिम्रगाम्" এর অর্থ হলো মৈথিলা কন্যা সীতাকে পাহাড়ের হরিণ দেখলেন। তাঁর পরের পংক্তিতে বলা হয়েছে। "निषसाद गिरिप्रस्थे" পাহাড়ের ওপর বসালেন, এর পর বলা হয়েছে "सीतां मांसेन छन्दयन्" সীতার মন ভালো করার জন্য মাংস দিলেন। এটা কি ওই হরিণের মাংস ছিলো? সেটা জানতে হলে পরের শ্লোকটি পড়তে হবে। 

इदं मेध्यमिदं स्वादु निष्ट प्तमिदम ग्निना
एवम अस्ते स धर्मात्मा सीतया सह राघवः ॥ २ ॥

इदं (idaṁ) - এই, मेध्यम् (medhyam) - স্মৃতি বর্ধক, সুপাচ্য বা ঔষধি গুল্ম ফল , इदं (idaṁ) - এটি, स्वादु (svādu) - সুমধুর, निष्टप्तम् (niṣṭaptam) - উপযুক্ত ভাবে তপ্ত করা, इदम् (idam) - এটি, अग्निना (agninā) - আগুণের দ্বারা, एव (eva) - সত্যই,  (ambre) - with Sita, धर्मात्मा (dharmātmā) - virtuous, सीतया (sītayā) - সীতার দ্বারা, सह (saha) - সহিত, राघवः (rāghavaḥ) - রঘুর পৌত্র বা বংশধর।

"ইদং মেধ্যম্, ইদং স্বাদু  নিষ্টপ্তম ইদং অগ্নিনা।" এটি স্মৃতি বর্ধক, এটি সুমধুর অগ্নী দ্বারা ভালো ভাবে তাপ দেওয়া হয়েছে বা রান্না করা হয়েছে। 

মেধ্য কি মাংস, নাকি অন্যকছু?

এখানে "ইদং মেধ্যম ইদং স্বাদু”  “মেধ্যম” শব্দটিকে ‘মাংস’ বলে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু আয়ুর্বেদ এবং সুশ্রুত সংহিতায় ‘মেধ্য’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে "মেধা বর্ধক উপকারী গুল্ম"। আবার “মেধ্য” শব্দের অন্য অর্থ হলো ‘পবিত্র’ (sacred), অথবা ‘ঈশ্বরকে উৎসর্গ করা হয়েছে’ এমন কিছু। 

সংস্কৃত শব্দকে ইংরেজী ভাষায় ভাষান্তর করতে গিয়ে  ইংরেজ বিদ্বান গন পবিত্র বা নিবেদিত ভোগকে sacrifice (স্যাক্রিফাইস) অনুবাদ করেছেন। সম্ভবত সেই ইংরেজী অর্থ ধরেই “মেধ্য” শব্দকে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা মাংস বলে ভুল করেছেন। 

একই শব্দের বহু অর্থ থাকতে পারে। কোন ক্ষেত্রে কোনটা হবে সেটা বিবেক দ্বারা বিচার করে ব্যবহার করা উচিত। দেখুন মেধ্য শব্দের বিভিন্ন অর্থ আছে।

অতএব শ্রী রাম পশু বা হরিণের মাংস নয়। ফল বা কন্দ মূল্যের শাস দিয়ে সীতা মাতাকে সন্তুষ্ট করেছেন। আমি কিভাবে কথা বলছি? এর প্রমাণ এর আগের অধ্যায় এই কাণ্ড শুরু হওয়ার ঠিক আগের একটি শ্লোকেই তিনি করেছেন। 

শ্রীরামের নিরামিষ খাওয়ার প্রতিজ্ঞা।

সেখানে তিনি সীতাকে বলেছেন, 

लक्ष्मणश्चैव धर्मात्मा मन्निदेशे व्यवस्थितः । त्वं चानुकूला वैदेहि प्रीति जनयती मम॥ १६॥

—বিদেহনন্দিনী ! ধার্মিক লক্ষ্মণ সর্বদা আমার আদেশ পালন করে থাকেন এবং আপনিও আমার ইচ্ছা পালন করেন; এটি আমার খুব প্রীয় করে তোলে।

उपस्पृशंस्त्रिषवणं मधुमूलफलाशनः। नायोध्यायै न राज्याय स्पृहये च त्वया सह॥१७॥

হে প্রিয়তমা! তোমার সাথে তিনবার স্নান (ত্রি সন্ধ্যা) করে মিষ্টি ফল ও শিকড় খেয়ে (मधुमूलफलाशनः) আমি অযোধ্যায় যেতে চাই না, রাজ্য পেতেও চাই না।

কৌশল্যার কাছে শ্রীরামের যে নিরামিষ খাওয়ার প্রতিজ্ঞা ছিল। সেই রঘু নন্দন রাম কি এভবে নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে?

যেখানে মন্দাকিনী ও চিত্রকুটের প্রকৃতিতে এতো সাত্ত্বিক, পুষ্টিকর ফলমূল, শাক, গুল্ম, লতা খাদ্যের সম্ভার আছে। তিনি কি না নিজের পেট ভরার জন্য পশু হনন করবেন? সেই ফল, মূল খেয়ে তিনি তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট। সেই সব কিছু নিয়েই শ্রী রাম সুখ অনুভব করছেন। 

ভাদুড়ী মহাশয় আরো লিখেছেন "সে প্রতিজ্ঞার কথা বনবাসের আতুর অবস্থায় অতি সঙ্গত কারণেই বাল্মীকি মনে রাখেননি।” এটা তার নিজস্ব ধারনা। কারণ তিনি রাম কে এবং বাল্মিকীকে সাধারণ গল্পকার হিসেবে মনে করেন। কোন গল্পকার তার কল্পনাকে নিজের ইচ্ছামত লিখতে পারে। কিন্তু রামায়ণে রামের জন্মক্ষন, গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, ঋতুকাল সব বর্ণনা করেছেন। এমনকি রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় গ্রহর অবস্থান গুলোও উল্লেখ  করেছেন।

বাল্মিকী বিরচিত রামায়ণ একটি সংস্কৃত সাহিত্য তো বটেই, সঙ্গে সেটি আমাদের ইতিহাসও বটে। শ্রীরাম কোন কাল্পনিক চরিত্র নয়, শ্রী রাম সত্য ভগবানের অবতার। যার যেমন দৃষ্টি তিনি তাকে তেমনভাবেই দেখেন। 

শ্রীরাম কি বাল্মীকির কল্পনা?

ভাদুরী মহাশয় শ্রীরাম কে বাল্মিকীর কল্পনা বা অতিরঞ্জিত চরিত্র মনে করেন। পূর্বক্ত আলোচনায় শ্রী রামের যে আতুরতা কথা তিনি বলেছেন সেটি কিসের আতুরতা? শ্রী রাম বলছেন, 'नायोध्यायै न राज्याय स्पृहये च त्वया सह'–“না অযোধ্যায় যেতে চাই, না আমার রাজ্ সুখের স্পৃহা আছে।”  বাল্মিকী রামায়ণকে তিনি খুবই সূক্ষ ভাবে কাল্পনিক বানানোর চেষ্টাও করেছেন। তাই ঋষির প্লটের সিকোয়েন্স ভূল করেছেন এমন কথা তিনি বলতে সাহস করলেন। তাই এ ধরনের যুক্তি অগ্রাহ্যকর এবং হাস্যকর।

পরিশিষ্ট:

তাহলে আমরা দেখলাম, ভাদুড়ী মশায় অর্থের অনর্থ তো করেছেনই, বৈষ্ণব ও ব্রাহ্মনদের ওপর নিন্দা টিপ্পনী করতে পিছুপা হননি। যেখানে তিনি নিজেই একজন ব্রাহ্মণ পুত্র।

আসলে ভাদুড়ী মশায় নিজের মতো করে আমাদের রামায়ণ ইতিহাস শাস্ত্রের অর্থকে ব্যখ্যা করেছেন। তিনি শ্রীরামকে কাজে লাগিয়ে ক্ষত্রিয়র মাংস ভক্ষণকে Justify করতে চান। হয়তো তিনি নিজেও ব্রাহ্মণ হয়ে, অনিয়ম করে মাংস ভক্ষণ করেন। 

মনে রাখতে হবে শ্রীরাম ইক্ষাকু বংশের ক্ষত্রিয় যুবরাজ তো বটেই। সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, তিনি একজন ঋষির বংশধর। তিনি মনু বিবস্বানের বংশধর ছিলেন। শুধু রামই  কেন আমরা আপনারা সকলেই কোনো না কোনো ঋষির বংশধর। আমাদের গোত্র, বর্ণ ও বেদ আছে। 

যে ব্রাক্ষণ আর বৈষ্ণবদের তিনি ক্ষত্রিয় রাজপুত্রের স্বাভাবিক খাদ্যাভাষ বাধা দেওয়া হয়েছে বলে টোকা দিচ্ছেন। সেই ব্রাহ্মণ বংশধর শ্রী রামকে তিনি মাংস ভক্ষক বানাচ্ছেন। এর পেছনে আমি একটাই উদ্দেশ্য দেখতে পাই, মাছ মাংস খাওয়ার পরম্পরাটা ব্রাক্ষণ সমাজেও Justify করতে চান।  

পক্ষে বিপক্ষে সব ধরনের যুক্তি থাকতেই পারে। তবে সেটা যেন মর্যাদার সীমানা অতিক্রম না করে। অনেক সময় কুযুক্তি হাস্যকর হয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন
InterServer Web Hosting and VPS

Copying content is illegal

Please refrain from copying content.