যথা হি চোরঃ স তথা হি বুদ্ধস্তথাগতং নাস্তিকমত্র বিদ্ধি।
তস্মাদ্ধি যঃ শক্যতমঃ প্রজানাং স নাস্তিকে নাভিমুখো বুধঃ স্যাৎ ।।
“যেমন চোর, সেইরকম বুদ্ধ তথাগতকে নাস্তিক বলে জানবেন। সেইজন্য প্রজাদের মধ্যে যিনি যোগ্যতম, তিনি কখনও নাস্তিকের অভিমুখী হবেন না।”
–এই অনুবাদটি কতোটা সঠিক সেটা স্থান কাল ও ব্যক্তি দিয়ে বিচার করা দরকার, কারণ শ্রী রামের জন্ম ত্রেতাকালে। বুদ্ধের বহু যুগ আগে। তাহলে রামায়ণে বুদ্ধের কথা আসলো কি ভাববে?
আবার এটাও বিচার করা উচিৎ, শাস্ত্র মতে ভগবান বুদ্ধ শ্রীহরি বিষ্ণুর অবতার। তাহলে বুদ্ধকে চোর বলার কারণ কি? রামের সময় তো বুদ্ধের থাকার কথা নয়। এই তথাগত এবং বুদ্ধ শব্দটি রামায়ণ মহাকাব্যে কিভাবে এলো? আসুন বিচার করে দেখি।
কোনো কিছু প্রমাণ করতে হলে সাক্ষ্য দরকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, এবং বিশ্বস্ত উৎস বা ব্যক্তির দ্বারা যা পাওয়া যায়, তাহাই প্রমাণ। এই ভিত্তি কেউ অস্বীকার করবে না। আজকের বিষয় গুলো নিম্নরুপ:
রামায়ণে বুদ্ধের নাম?
রামায়ণের দ্বিতীয় অধ্যায়, অযোধ্যা কান্ডর ১০৯ অধ্যায়ের ৩৪ ক্রমঙ্কের শ্লোকে বুদ্ধ ও তথাগত শব্দ পাওয়া যায়। এর প্রসঙ্গ ছিলো — দশরথ নন্দন রাজকুমার শ্রীরাম রাজা হওয়ার জন্য মনোনীত হন। সেই আনন্দ সংবাদে সকল অযোধ্যা নগরবাসী আনন্দে মেতে উঠেছিলো। ঠিক সেই সময়, রানী কৈকেয়ীর দাসী মন্থরার কুমন্ত্রনায়, কৈকেয়ী রাজা দশরথের সামনে ভরতকে রাজা এবং রামকে বনবাসে পাঠানোর শর্ত রাখেন। ভরত সেই সময় অযোধ্যায় ছিলেন না। পিতার বাক্য সত্য হয়, সেই শর্ত মেনে শ্রী রাম বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ভরত অযোধ্যায় ফিরে আসেন এবং শুনতে পান, শ্রীরাম রাজ সিংহাসন ত্যাগ করে বনবাসে গিয়েছে। তিনি তাঁর মাতাকে কূল ঘাতিনী, ও বহু কটূ শব্দ ব্যবহার করে দাদা রামের খোঁজ করতে করতে রাজ্জানুবর্গ ও বিদ্যাণ ঋষিদের নিয়ে রাম কে অযোধ্যায় ফিরে যাওয়ার জন্য বনবাসী রামের কুটিরে উপস্থিত হন। তিনি বারবার শ্রী রামকে অনুরোধ করেন কিন্তু শ্রী রাম পিতার আজ্ঞা পালন ও রঘুকুলের আদর্শ স্থির রাখতে ভারতকে ফিরিয়ে দেন।
তখন জাবালি নামক একজন ঋষি, শ্রীরামের এই সিদ্ধান্তকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে শ্রী রামকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। জাবালি শ্রী রামকে তত্ত্ব জ্ঞান দিয়ে বলেন, “হে রঘু নন্দন, আমার মতে আপনার মতো শ্রেষ্ট, বুদ্ধিমান, সুপুরুষকে এমন বৃথা চিন্তা করা উচিৎ নয়। এই সংসারে কে কার বন্ধু? কার কাছে কার কি প্রাপ্য? জীব একাই জন্ম নেয় এবং একাই মৃত্যু বরন করে। তাই আপনাকে এই কন্টক পূর্ণ এবং উঁচু-নিচু পথের দূর্গম জীবন ছেড়ে আপনার পিতার রাজ সিংহাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত।"
জাবালির উপদেশকে খুব ন্যায় সংগত ও শ্রী রামের পক্ষেই মনে হয়। কিন্তু এই বক্তব্য শ্রী রামের পছন্দ হয়নি। কারণ, শুনতে মধুর হলেও এর মধ্যে কতটা বিষ ও অনৈতিকতা আছে, সেটির ফলাফল কি হতে পারে, সেটা বিস্তারিত মরা নিচে আলোচনা (---তাহলে নাস্তিকদের চোর বলার পেছনে কারণ কি--) করবো। এর জবাবে শ্রী রামের ঋষি জাবালিকে যে ধিক্কার উক্তি করেন সেটা বাল্মিকী রামায়ণে যে ভাবে লেখা হয়েছে সেটি নিম্নরূপ:
সত্যং চ ধর্মং চ পরাক্রমং চ ভূতানুকম্পাং প্রিয়বাদিতাং চ। দ্বিজাতিদেবাতিথিপূজনং পন্থানমাহুস্ত্রিদিবস্য সন্তঃ ॥ ৩১॥
সাধক গন বলেন, সত্য, ধর্ম, পরাক্রম, জীবে দয়া (সেবা), প্রিয়বচন, দেবতা ব্রাহ্মণ ও অতিথি- পূজন-এইগুলিই দিব্য লোকে গমনের পথ।
তেনৈবমাজ্ঞায় যথাবদর্থ- মেকোদয়ং সম্প্রতিপদ্য বিপ্রাঃ। ধর্মং চরন্তঃ সকলং যথাবৎ কাক্ষন্তি লোকাগমমপ্রমত্তাঃ ।। ৩২
তাই, অপ্রমত্ত ব্রাহ্মণগণ এই কথার যাথাত্য অনুধাবন করে বিধিবৎ ধর্মাচরণ দ্বারা ব্রহ্মলোক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা করে থাকেন।
নিন্দাম্যহং কর্ম কৃতং পিতৃস্তদ্যন্ত্রামগৃহাদ বুদ্ধ্যানয়ৈবং বিধয়া চরন্তং বিষম বুদ্ধিম্। সুনাস্তিকং ধর্মপথাদপেতম্ ।। ৩৩
আমি আমার পিতার সেই বুদ্ধি কাজকে নিন্দা করি, যিনি আপোনার মতো বিপথগামী বুদ্ধির এমন ভ্ৰষ্ট চিন্তা (বিষম বুদ্ধি) দ্বারা পৰিচালিত, চরম নাস্তিক এবং ধৰ্ম পথ বিচ্যুত ব্যক্তিকে নিজর সভায় (বা পুরোহিত হিসেবে দিয়ে ছিলেন।
এই শ্লোকটি আরেক প্রকাশনীর দ্বারা এই ভাবে লেখা হয়েছে —
নিন্দাম্যহং কর্ম পিতুঃ কৃতং তদ্যস্ত্বামগৃহ্ণাদ বিষমস্থ বুদ্ধিম্ ৷ বুদ্ধ্যানযৈবংবিধযা চরন্তং সুনাস্তিকং ধর্মপথাদপেতম্৷৷
উভয় ক্ষেত্রেই এর অর্থ— "আমি আপন পিতার এই কর্মের নিন্দা করছি যা আপনার মত বিষম বুদ্ধিমত্তা কে গ্রহন করেছেন। এই ধরনের (বিষম) বুদ্ধি ধর্মপথ থেকে পতিত করে চরম নাস্তিকে পরিণত করে।"
অর্থাৎ রামায়ণে একই শ্লোকের এই ধরনের প্রয়োগ থেকে বোঝা যায় যে, কোনো না কোনো সময় রামায়নে এই শ্লোক গুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যেখানে বুদ্ধ বা বুদ্ধির দ্বারা বিবেচনা করাকে ছোটো করা হয়েছে। এই কাজ কোনো ব্রহ্মনের নাকি বৌদ্ধের, নাকি ইংরেজদের সেটা বিষয় নয়। বিষয় হলো — বিকৃত করা হয়েছে।
এখানে "বুদ্ধ্যানুযৈবং" এর অর্থ হলো — ( বুদ্ধ্যা + অনয়া + এব) "বুদ্ধি অনুযায়ী" বা "বুদ্ধিমত্তার অনুসারে"। "বুদ্ধ্যা" বা "বুদ্ধি" শব্দটি বুদ্ধি বা বোধ সম্পর্কিত, আর "অনুযৈবং" শব্দটি অনুসারে বা অনুসরণ করে এই অর্থ ব্যবহার করা হয়। সুতরাং, "বুদ্ধ্যানুযৈবং" বোধশীলতা বা বুদ্ধির পরিমাণের অনুযায়ী অনুসরণ করে বা এর অনুসারে একটি ক্রিয়া বা অবস্থা বিবেচনা করে।
শ্রীরাম নিজ পিতার এই কর্মের নিন্দা করছেন কেন?
এরপরের শ্লোক টি দেখুন: —
হ্যা, আপনি ঠিকই পড়ছেন। এখানে বুদ্ধ ও তথাগত উভয় শব্দই উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকেই এটি বিক্ষিপ্ত বলে মনে করেন। কারণ শ্লোকটির বর্তমান প্রসঙ্গের সঙ্গে কোনো অর্থ স্পষ্ট হয় না। ত্রেতা যুগেতো তথাগত বুদ্ধ ছিলো না। তাই আধুনিক অনেক বিদ্যান রামায়ণ বৃদ্ধের পরবর্তী রচনা বলে মনে করেন।
কিন্তু আমি মনে করি এখানে ‘বুদ্ধ’ বা ‘তথাগত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ব্যাবহার করতে হবে। কারণ কি জানেন "বুদ্ধ" বা ‘তথাগত’ কোনো ব্যাক্তি নয়। বুদ্ধ কথার অর্থ হলো ‘বুদ্ধি’ বা ‘বোধি প্রাপ্ত হাওয়া'। বুদ্ধ ধর্ম অবলম্বনকারী বৌধরাই,বুদ্ধ বা বুদ্ধের মূর্তির পূজা করেন না। তাঁদের "বুদ্ধ্যং স্মরনং গচ্ছামি” শব্দটি বোধ বা জ্ঞানের স্মরণ নেওয়ার কথা বলে। তাই 'বুদ্ধস্' কথার অর্থ বুদ্ধি এবং "তথাগত" অর্থ "যেমন এসেছে তেমন গেছে", যা বৌদ্ধ ধর্মে বুদ্ধের উপাধি, কিন্তু এখানে এটি অস্তিত্ববাদী চিন্তার প্রতীক হবে।
তথাগত শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ করলে দাড়ায় "তথা + আগত" অর্থাৎ "যে প্রকারে সেটি আগত।" ওপরের ৩৩ নম্বর শ্লোকটি বলছে, “বুদ্ধ্যানয়ৈবং” সেখানে ‘বুদ্ধ্যানয়ৈবং’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে বুদ্ধি। তাই, পরের শ্লোকে 'বুদ্ধ' শব্দের অনুবাদ বুদ্ধিই হবে।
এবার ওই শ্লোকটির এই অর্থ দিয়ে এবার পড়ুন: — "যেমন চোর, বুদ্ধিও তেমনি। জেনে রাখুন যে প্রকারে এই নাস্তিকতা (যারা বেদ বা শাস্ত্র সিদ্ধান্ত মানে না তারা) তারা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অবিশ্বাসী পুরুষ।একজন বিদ্বান মানুষের উচিত নাস্তিকতাকে এড়িয়ে চলা।
এই শ্লোকে বলা হলো যে, পূর্বের দ্বিজজনদের (অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) বেশি কর্ম করে অনেক অনুকূল কর্ম পূর্ণ করতো। তারপরে, তারা সমস্ত লোকের (ছিত্ত্বা আর সদ্যম) উন্নতি করেছিলেন। এবং তারা যারা ভালো কর্ম এবং যাগ্য কর্ম পূর্ণ করেছিলেন।
—স্পষ্টত, শ্রী রাম তাঁর পিতা দশরথের বাণী যাতে মিথ্যা না হয়ে যায়। সেই সত্য ব্রত পালনের জন্যে রাজ সিংহাসন ও রাজ মুকুটকে তুচ্ছ করে বনে গিয়ে বনবাসীর জীবন যাপন করছেন। পিতার প্রতি শ্রী রামের এই ত্যাগ সাধারণ মানুষের ধারনার অতীত। (এখানে 'বুদ্ধ' বলতে বেদ-নিন্দুক, কু-তর্ককারী বা নাস্তিক পণ্ডিতকে বোঝানো হয়েছে)।
তাহলে নাস্তিকদের চোর বলার পেছনে কারণ কি?
আসলে বেদ বা শাস্ত্র সিদ্ধান্ত বিরোধীদের নাস্তিক বলা হয়। নাস্তিকরা নিজের বুদ্ধির দ্বারা ধর্ম শাস্ত্রকে, বা শাস্ত্র সিদ্ধান্তকে নিজের সুবিধা অনুযায়ী বিচার করে। স্পষ্ট ভাবে বললে মিষ্টি বাক্য দিয়ে অর্থ বিকৃত করে অন্যায়কে ন্যায়, এবং অ-নীতকে নীতি বলে প্রচার করে। এমন দূর্বুদ্ধি ব্যক্তি পরমার্থ থেকে সর্বদাই বিচ্যুত হয়ে যায় এবং সে যে পথে চলে, সেটি চোরের মতই অসৎ পথ।
কারণ চোর কখনই সামনের দরজা দিয়ে ঢোকে না। সে অন্যায় ভাবে, বা চোখ ফাঁকি দিয়ে, নিজের সুখের জন্য অন্যের সম্পদ হরণ করে। এই ধরনের চারু বাক বা পুষ্পিত বাক্য বা (speak gracefully) সোমৃদ্ধ লোকেদের চার্বাক বলা হয়। যারা অনীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহন করে।
👉সেই রকম পুষ্পিত, বিকৃত এবং অনৈতিক বক্তব্যই শ্রী রামকে জাবালি উপদেশ করেছিলেন। জাবালির উপদেশকে খুব ন্যায় সংগত হলেও একটু গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখুন: আমার মতে আপনার মতো শ্রেষ্ট, বুদ্ধিমান, সুপুরুষকে এমন বৃথা চিন্তা করা উচিৎ নয়। এরপর বলছেন -
- এই সংসারে কে কার বন্ধু? ( অর্থাৎ, ভাই ভাইয়ের মধ্যে কোনো মিত্রতা বজায় রাখার দরকার কি? )
- কার কাছে কার কি প্রাপ্য? ( অর্থাৎ, আপনি রাজা হলে কারো কিছু বলার নাই, যেহেতু শ্রী রাম বড় ভাই )
- জীব একাই জন্ম নেয় এবং একাই মৃত্যু বরন করে। ( অর্থাৎ, যতদিন জীবিত আছেন নিজের সুখ আগে দেখুন।)
- তাই আপনাকে এই কন্টক পূর্ণ এবং উঁচু-নিচু পথের দূর্গম জীবন ছেড়ে আপনার পিতার রাজ সিংহাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। ( অর্থাৎ, আদর্শ গত রাজনীতি নয় , নিজের সুখ সমৃদ্ধি আগে সগ্রহ করুন। )
এই ধরণের বুদ্ধিকে চার্বাক দর্শন বলে, "যতদিন বাঁচবে সুখে বাঁচবে, প্রয়োজন পড়লে ঋণ করেও ঘি খাবে।" এর অর্থ হলো, বেঁচে থাকার জন্য যদি আপনি অনৈতিক ভাবে কোন কিছু করেন তবে সেটাও চার্বাক দের কাছে গ্রহণযোগ্য। চার্বাক দর্শন মতে, অন্যকে দুঃখ দিয়ে, ছলনা করে, নিজে সুখ ভোগ করতে করতে বেঁচে থাকাটাই জীবনের স্বার্থকতা। তাই, শ্রী রাম জাবালিকে সাবধান করে দিয়েছেন।
এমন মিষ্টি মিষ্টি বাস্তববাদী কথা বলা চারুবাক জাবালির বুদ্ধিকে রাম ধিক্কার করেছেন। কারণ, চার্বাক নাস্তিকদের কেউ বিশ্বাস করে না। তারা সময়কে ভোগ করতে সুযোগ খোঁজে। এতে করে কার কি ক্ষতি হোলো, কার জীবনে কি প্রভাব পড়লো সেটা বিচার করে না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিংড়ে ভৌতিক সুখ ভোগ করাই তাঁদের জীবনের অন্তিম লক্ষ্য।
এই অংশটি রামায়ণের দার্শনিক গভীরতা দেখায়, যেখানে নাস্তিকতা বনাম ধর্মের বিতর্ক উঠেছে। জাবালি পরে স্বীকার করেন যে তিনি শুধু রামকে ফিরিয়ে আনার জন্য এমন কথা বলেছিলেন, আসলে জাবালি নাস্তিক ছিলেন না।
ধর্ম নিয়ে বিবাদ
অনেকের মতে রামায়ণের "যথা হি চোরঃ স তথা হি বুদ্ধ- স্তথাগতং" শ্লোক বিকৃত করা হয়েছে বলে মনে করেন। অনেকের মতে সম্পূর্ন রামায়ণটাই বুদ্ধের পরবর্তীতে লেখা হয়েছে বলে দাবী করা হয়। এরকম অনেক তর্ক বিতর্ক আছে।
শুধু বুদ্ধ বনাম রাম নয়। বিষ্ণু বনাম কালি, শিব বনাম কৃষ্ণ, এই ভাবে হিন্দু বনাম মুসলিম, মুসলীম বনাম ইহুদী, ইহুদি বনাম হিটলার, ইত্যাদি ইত্যাদি বিবাদের শেষ নেই। কেউ নিজেরটা নিয়ে সুখী হতে পারে না। ঈর্ষা, অভিমান এবং নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা নিয়ে একে অন্যের খেলাফ করে। এই সব কিছুই মানুষের অজ্ঞতা ও রাজনীতির অন্তর্গত।
যারা বলে আমরা রাজনীতির মধ্যে ধর্মকে মেশাই না। আসলে তারাই ধর্মকে ঢাল করে বার বার রাজনীতির ময়দানে নিজের বস্ত্র হরণ করে। আবার যারা বলে, আমরা ধর্ম রক্ষার জন্যই রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি। তাঁরা সত্য কথাই বলে।
একদা হিটলার ইহুদীদের নির্মম ভাবে হত্যা করেছিলো। সেথায় রাজনীতির মূল ছিলো জাতি জাতি বিদ্বেষী পক্ষপাত। হিটলার ইহুদীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়েই এই ঘৃণ্য কাজ করেছিল। কারণ তার মনে ইহুদীদের প্রতি ছোটো বেলা থেকেই ঘৃণার জমে ছিলো।
ভারত পাকিস্থান বিভাজন সেটাও Hindu-Muslim বিবাদ থেকেই উৎপন্ন হয়েছিলো। কতো হাজার হাজার মানুষের জীবন গেছে বলে শেষ করা যাবে না।
যারা সেক্যুলার, সামাজিক বিপ্লবে বিশ্বাসী, তারাও কোনো না কোনো ভাবে এই ধর্মীয় বিবাদ থেকে আলাদা করে কিছু করতে পারছে না। তারাও ঘুরে ফায়ার জাত ধর্ম নিয়ে টিপ্পনি করছেন। তারাও ধর্ম ঘেটে ধর্মের রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছেন। কারণ মানুষের সব থেকে কাছের জিনিস তার পরিচয়।
যারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে না এবং যারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে —তারা উভয়ই পরষ্পরের বিরোধ করে। এক পক্ষ মনে করে ধর্মই শান্তি বজায় রাখতে পারে। আরেক পক্ষ মনে করে, যত অশান্তি এই ধর্ম থেকেই। তাই ধর্ম মুক্ত হলেই শান্তি ও সমৃদ্ধি হবে। এই দুই জনের মাথায় ধর্ম ছাড়া কিছুই নেই। একে অপরের পরিপূরক।
তাই, যে যা বলে। তাকে বলতে দাও। নিজ ধর্ম-কর্ম নিজের কাছে। কিন্তু বিবাদ যখন উঠেছি, বুদ্ধ আগে না রাম আগে, মুরগি আগে না ডিম আগে। সেই বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে তো পৌছাতেই হবে।
বুদ্ধ আগে, না রাম আগে?
যদি ভগবান বুদ্ধ রামের আগে আসে তবে বুদ্ধের জীবনীতে ভগবান রাম বা সীতা, লক্ষণ, ইত্যাদির উপাখ্যান থাকা সম্ভব নয়। এর বিপরীতে যদি ভগবান রাম বুদ্ধের আগে আসে, তবে ভগবান বুদ্ধের নাম উল্লেখ্য তাঁর সমসাময়িক হওয়া উচিত নয়।
বুদ্ধের ধর্ম গ্রন্থ বা জীবনী পড়লে আমরা অনেক শব্দ প্রমাণ পাই যেমন, বুদ্ধ জাতি ও বর্ণের ভেদাভেদের তুলে মানুষকে বাস্তব জীবনের সত্য ও জীবনের কঠিন সত্যকে গ্রহন করার কথা বলেছেন। তিনি বহু ব্রাহ্মন পণ্ডিতকে তাঁর যুক্তি ও তর্ক দ্বারা পরাজিত করে নিজের শিষ্য করেছেন। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জাতক অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের পূর্ব জন্মের গল্প গুলোতে বুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি, পূর্বজন্মে বুদ্ধ কিভাবে জীবন যাপন করেছিলেন সেই সব কথা উল্লেখ করা আছে। সেখানেই আমরা শ্রী রামের উল্লেখ পাই । যদি ভগবান ব্রাহ্মন ও বহু ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিতদেরকে তাঁর যুক্তি ও তর্ক দ্বারা পরাজিত করে থাকেন তবে ওই ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিত কিভাবে ছিলো ?
বৌদ্ধ জাতকে রাম, লক্ষণ সীতা।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ৪৬১ নং জাতক যার নাম ‘দশরথ জাতক’। সেখানে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, সীতা ও দশরথের কথা বলা হয়েছে। এখানে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, ও সীতাকে দশরথের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রাম-সীতাকে ভাইবোন হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সেই জাতক কথা মতে ভরত যিনি মহারাজ দশরথের দ্বিতীয় স্ত্রীর পুত্র। তিনি তার পুত্রের জন্য মহারাজ দশরথের কাছে বর চান। ভরত সিংহাসন দখল করবে বলে দশরথের ইচ্ছায় নিজের প্রাণ বাঁচাতে রাম-সীতাকে নিয়ে বনবাসে পালিয়ে যায়। এরকম একটি গল্প রচনা করা হয়েছে।
কিভাবে বুঝব কোনটা সত্য ?
বেশিরভাগ জাতক কথায় বেনারসের রাজা ব্রহ্মদত্ত কে বলা হয়েছে, যার 16 হাজার পার্ট রানী ছিলো। এই দশরথ জাতকে বেনারসের রাজা হিসেবে দশরথকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যার 16 হাজার পাঠ রানী ছিলো।
এক দিকে রামায়ণে বুদ্ধ আরেকদিকে জাতক কথায় রাম -লক্ষণ, দুটোই প্রামানিক
এই জাতক কথা গুলোতে বুদ্ধ পূর্বজন্মের কথা বলছেন। বুদ্ধ পূর্বজন্মের কথায় যদি নিজেকে রামায়ণের শ্রী রাম, রূপে বর্ননা করেন তবে এটাও প্রমান করে যে বুদ্ধ রামায়ণ সম্পর্কে জানতেন। পূর্বজন্মে তিনিই রাম ছিলেন। তবে এই জাতক শ্রী রাম লক্ষ্মণ ও মাতা সীতাকে ভাই-বোন হিসেবে দেখায়।
আবার এরকম সম্ভাবনা থাকতে পারে এই বুদ্ধ জাতক বুদ্ধ বলেননি। এগুলো তার পরবর্তী শিষ্যরাই ইচ্ছা করে এই বিকৃতি করছে। যেখানে ইচ্ছাকৃত ভাবে বেনারসের রাজা ব্রহ্মদত্ত কে দশরথ, শ্রী রামকে মাতা সীতার ভাই রূপে প্রদর্শন করা হয়েছে।
এরকম আরেকটি রামায়ণ গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে যেখানে সীতাকে রাবণের কন্যা রূপে দেখানো হয়েছে, হনুমানকে লম্পট দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্বেও বিভিন্ন ভাবে শ্রী রামের ভাবমূর্তিকে বিকৃত করা হয়েছে। কিন্তু আমরা আজও বুদ্ধকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। এই সব উদাহরণ থেকে এটা অনুমান করা যেতেই পারে আজকের এই আম্বেদকর দ্বারা গঠিত পলিটিকাল নববুদ্ধ রা কতটা সত্য বা কতটা মিথ্যা বলছে।
পূর্বেও বিভিন্ন ভাবে শ্রী রামের ভাবমূর্তিকে বিকৃত করা হয়েছে। কিন্তু আমরা আজও বুদ্ধকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। কারণ আমাদের বিশ্বাস ভগবান সব রূপেই পবিত্র। তিনি বেদ বিরুদ্ধ কথা বলে তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতিকে উন্নত করেছেন।
এটা প্রমাণ করে দেয় যে, বৌদ্ধ উপাসকরা নিজেরাই রামকে বুদ্ধের পূর্বে স্বীকার করেছেন। এবং পূর্ব জন্মে বুদ্ধ রাম হিসেবে নিজেকে স্বীকার করেছিলেন। পার্থক্য শুধু একটাই চালাকি ঠিক ঠাক করতে পারেননি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রামের জন্ম বুদ্ধের আগে তাই রামায়ণ ও বুদ্ধের আগে।
পণ্ডিতদের মত (রামের জীবন কালেও বৌদ্ধ ছিলেন)
বিভিন্ন পন্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি যেমন বর্তমান সময়ের পুরী শঙ্করাচার্য স্বামী নিশ্চলানন্দ বলেন, "রামের সময়েও বৌদ্ধ মতাবলম্বী রা ছিলেন।" যারা বেদ নিন্দুক বা বিপরীত মতাদর্শী। কারণ নেপালের যে বুদ্ধের কথা আমরা জানি, তিনি প্রথম বুদ্ধ নন। নেপালের লুম্বিনীতে জন্ম নেওয়া সিদ্ধার্থ গৌতম (ঐতিহাসিক গৌতম বুদ্ধ) এই উপাধি পেয়েছিলেন। এমনকি স্বয়ং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব শাস্ত্র (যেমন 'বুদ্ধবংস') অনুযায়ীও গৌতম বুদ্ধই প্রথম বুদ্ধ নন; তাঁর আগে দীপঙ্কর, কাশ্যপ, ক্রকুচ্ছন্দ সহ আরও অনেক অতীত বুদ্ধের অস্তিত্বের কথা বৌদ্ধ সাহিত্যেও স্বীকার করা হয়েছে।
সনাতন শাস্ত্র এবং পুরাণগুলোতে (যেমন শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ) ভগবান বিষ্ণুর যে বুদ্ধ অবতারের উল্লেখ রয়েছে, অনেক শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের মতে তিনি এবং খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের সিদ্ধার্থ গৌতম এক ব্যক্তি নন। পৌরাণিক বুদ্ধ অনেক প্রাচীন। তিনি ত্রিপুরাস্থ অসুরদের (বা বেদ-বিরোধী মনোভাবাপন্নদের) বিভ্রান্ত করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে পুরাণে উল্লেখ আছে। তাই রামায়ণের যুগে (ত্রেতাযুগে) বেদ-নিন্দুক 'বুদ্ধ' বা নাস্তিক মতাবলম্বীদের অস্তিত্ব থাকাটা শাস্ত্রীয় কালক্রম অনুযায়ী একেবারেই অসম্ভব নয়।
আদি গুরু শঙ্করাচার্যকে মূলত বৈষ্ণব আচার্যগণ এবং দ্বৈতবাদী বা ভক্তিভাবাপন্ন দার্শনিকরা (যেমন রামানুজাচার্য, মধ্বাচার্য, চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামীরা) "প্রচ্ছন্ন বুদ্ধ" বা ছদ্মবেশী বৌদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 'পদ্মপুরাণ'-এ একটি শ্লোক পাওয়া যায় যেখানে বলা হয়েছে: "মায়াবাদমসচ্ছাস্ত্রং প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধমুচ্যতে..." অর্থাৎ মায়াবাদ হলো অসৎ শাস্ত্র এবং এটি প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধবাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
ভগবান বুদ্ধ যেমন বেদের যজ্ঞ বা যাগযজ্ঞমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, আচার্য শঙ্করও মোক্ষলাভের ক্ষেত্রে বৈদিক কর্মকাণ্ড বা যজ্ঞকে চূড়ান্ত বলে মানেননি। তিনি জ্ঞানমার্গ ও সন্ন্যাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মোক্ষের জন্য কর্ম বা উপাসনা নয়, আত্মজ্ঞানই একমাত্র পথ—এই ধারণাটি তাঁর বিরোধীদের চোখে তাঁকে বৌদ্ধদের কাছাকাছি দাঁড় করিয়েছিল।
আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা রামায়ণের এই শ্লোকটিকে অনেক সময় গৌতম বুদ্ধের পরবর্তীকালে রচিত 'প্রক্ষিপ্ত' (পরে যুক্ত করা) অংশ বলে মনে করেন। কিন্তু পণ্ডিত ও শঙ্করাচার্যদের মত অনুযায়ী, আস্তিক (বেদ-অনুসারী) এবং নাস্তিক (বেদ-নিন্দুক ও কেবল যুক্তিনির্ভর) মতাদর্শের এই দ্বন্দ্ব ভারতে আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। রামায়ণের শ্লোকে শ্রীরামচন্দ্র মূলত সেই প্রাচীন বেদ-বিরোধী যুক্তিবাদী পণ্ডিতদেরই (যাঁরা নিজেদের 'বুদ্ধ' বা অতিরিক্ত জ্ঞানী মনে করতেন) সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলে সতর্ক করেছেন।
পরিশিষ্ট
এই উক্ত 'বুদ্ধ 'এবং 'তথাগত' শব্দ দু'টি ভগবান বুদ্ধের নামকে নির্দেশ করছে না। বুদ্ধ কোনো ব্যক্তির নাম নয়। গৌতম বুদ্ধ হলেন বৌদ্ধধর্মের ২৮তম বুদ্ধ ও একজন তপস্বী ও জ্ঞানী। সিদ্ধার্থ গৌতম, শাক্যমুনি বুদ্ধ, এমন বহু বুদ্ধ আছেন। এবং ভবিষ্যতে আসবেন। এই ‘বুদ্ধ’ একটি উপাধি মাত্র। যদি আমরা আমাদের দেশের বুদ্ধের জীবনী পড়ে দেখি। সেথায় বুদ্ধের নাম ছিল সিদ্ধার্থ। এই সিদ্ধার্থ ছিলেন রাজা শুদ্ধোধন ও মায়াদেবীর সন্তান পুত্র।
একদিন শাক্যমুনি রাজা শুদ্ধোধনের রাজ সভায় এসে হাজির হন। তিনি সিদ্ধার্থকে দেখে তাঁর ভবিষ্যত বাণী করে চলে যান। সিদ্ধার্থ বৈরাগী সন্ন্যাসী হবে। রাজা চিন্তিত হয়ে সিদ্ধার্থকে ভোগ বাসনায় ডুবিয়ে রেখেছিলেন। এরপর একটি ঘটনা সিদ্ধার্থের মন ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তিনি জীবনের সত্যকে খুঁজতে খুঁজতে গয়ার এক বট বৃক্ষের নিচে বসে, ধ্যানমগ্ন হয়ে, বোধি প্রাপ্ত হয়ে, সিদ্ধার্থ থেকে বুদ্ধ নামে পরিচিত হন।
প্রচলিত “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি” —এর অর্থ বুদ্ধ নামক কোনো ব্যাক্তির স্মরনাপন্ন হওয়া নয়। নিজের মধ্যে মুক্তির বীজ জাগিয়ে বুদ্ধকে জাগরিত করে তোলা। কারণ, বুদ্ধ নিজেই বলেছেন আমি তোমাদের মুক্তি দিতে পারবো না। তোমরা নিজেরাই নিজের মুক্তির পথ খুঁজে নেবে। রামায়ণে সেই বুদ্ধের উল্লেখ নেই। রামায়ণ প্রসঙ্গটি জবালির বিষম বুদ্ধির কথা বলেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন