আজকে আলোচনা করব উপনয়ন কি ও কেন এটি এতো তাৎপর্য পূর্ণ। এর সঙ্গে সঙ্গে জানবো প্রাচীন বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার সাথে এর প সম্পর্ক কী। কোনো অলৌকিক ব্যাখ্যা নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রমাণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থাকে বোঝার চেষ্টা করব। হিন্দু ধর্মের ষোলো সংস্কারের অন্যতম একটি হলো উপনয়ন। বর্তমান যুগে আমরা অনেকেই উপনয়ন বলতে কেবল 'পৈতে ধারণ' বা একটি ধর্মীয় আচারকে বুঝি। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর সামাজিক ও মানবিক উদ্দেশ্য।
একটি প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা এবং তার খণ্ডন
অনেকে উপনয়ন শব্দের ভুল ব্যাকরণ বা মনগড়া ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারা বলেন—‘উপ’ অর্থে ‘সমীপে’ আর ‘নয়ন’ অর্থে ‘চোখ’। অর্থাৎ তাদের মতে, উপনয়ন শব্দের অর্থ ‘চোখের সামনে দেখা’ বা ‘তৃতীয় নয়ন জাগ্রত করা’।
কিন্তু এই ব্যাখ্যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো উপনয়ন অনুষ্ঠানের আচারসমূহ। এই অনুষ্ঠানে বালককে পৈতে পরিয়ে রাজকীয় কোনো অনুভূতি দেওয়া হয় না, বরং তাকে সন্ন্যাস, ভিক্ষাচরণ এবং ত্যাগের শপথ দেওয়া হয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, এটি কোনো অলৌকিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি কঠোর ছাত্রজীবন শুরু করার একটি সামাজিক প্রতিজ্ঞা। আজ একে একটি এলিট শ্রেণির Status হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এটি অভিজাত পরিবারের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়।
উপনয়ন শব্দের অর্থ ও উৎপত্তি
“উপনয়ন” শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ “উপনীত হওয়া” (Arrival) থেকে। কোনো বালক যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে কোনো একটি শুভদিনে সমবেতভাবে গুরুগৃহে, যাকে গুরুকূলে ব্রহ্মচর্য ও বেদ উপনিষদ ইত্যাদি শিক্ষার জন্য উপনীত বা উপস্থিত হতো, তখন তাদেরকে একটি আনুষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে আশ্রম জীবনে বরণ করতে হতো— এটিই ছিলো উপনয়ন।
ব্যাকরণ গতভাবে, সংস্কৃত ‘উপ-নীত’ শব্দের অর্থ হলো "নিকটে নিয়ে যাওয়া"। অর্থাৎ, পিতা বা অভিভাবক কর্তৃক সন্তানকে উপযুক্ত সুশিক্ষার জন্য গুরুর সমীপে সমর্পণ করতো।
আধুনিক তুলনা: বর্তমান সময়ে এর তুলনীয় কোনো উদাহরণ নেই। তবে বর্তমান যুগে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নবীন বরণ (Freshers’ Welcome) অনুষ্ঠান হয়, প্রাচীনকালের উপনয়ন ছিল ঠিক সেরকমই একটি উৎসব বা 'Arrival Ceremony'।
উপনয়ন কেন করা হতো? (উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য)
জীবন পরিবর্তনের যেকোনো স্মরণীয় মুহূর্তকে মানুষ উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করতে ভালোবাসে। একটি শিশুর পারিবারিক জীবন থেকে ছাত্রজীবনে (আশ্রম জীবন) প্রবেশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাই মস্তক মুণ্ডন, গঙ্গাস্নান এবং যজ্ঞের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানটি পালন করতে হতো। যাতে করে বালক এর গুরুত্ব স্মরণ রাখে। ব্রহ্মচর্য যারা পালন করেন, তাদের বলা হয় ব্রহ্মচারী। ব্রহ্মচারীকে তিনটি সূত্র three thred উপনয়ন দেওয়া হতো। এটি তিনটি শর্ত পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করা হতো। এই তিনটি শর্ত বা অঙ্গীকার গুলো :
- ১. শম (মনোনিগ্রহ): মনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, মনকে শান্ত রাখা এবং অযথা রাগ, ক্ষোভ বা আবেগের বশবর্তী না হওয়া।
- ২. দম (ইন্দ্রিয় সংযম): পঞ্চেন্দ্রিয়কে (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক) নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। বাহ্যিক কোনো প্রলোভন বা লালসা যেন তাকে তার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।
- ৩. তপ (তপস্যা বা কঠোর সাধনা): সমাজের কল্যাণের জন্য এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করার মানসিকতা।
উপনয়ন অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যগুলো ছিল:
- মূল্যবোধের শিক্ষা: বালককে সন্ন্যাস, ভিক্ষা, আত্মত্যাগ এবং কঠোর শৃঙ্খলা পালনের শপথ দেওয়া হতো।
- মানসিক প্রস্তুতি: বিলাসবহুল পারিবারিক পরিবেশ ছেড়ে গুরুগৃহে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার মানসিক শক্তি অর্জন করা।
- দ্বিজ বা দ্বিতীয় জন্ম: শাস্ত্র মতে, মানুষের প্রথম জন্ম হয় মায়ের গর্ভে (শারীরিক জন্ম)। আর উপনয়নের মাধ্যমে গুরুর আশ্রমে মানুষের বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম ঘটে, তাই তাকে বলা হয় "দ্বিজ"। মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে গুরু হলেন পিতা এবং বেদ হলেন মাতা। ২য় অধ্যায়ের ১৭০ নম্বর শ্লোকে:
তত্র যদ্ ব্রহ্মজন্মা্য মৌঞ্জীবন্ধনচিহ্নিতম্ ।তত্রাস্য মাতা সাবিত্রী পিতা ত্বাচার্য উচ্যতে ॥ (২/১৭০)
বর্ণাশ্রম ও উপনয়নের সম্পর্ক
“উপনয়ন” এবং “বর্ণাশ্রম” শব্দ দুটি একে অপরের পরিপূরক। আজকাল আমরা ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণপ্রথা শব্দটি শুনতে পাই। আসলে এই ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং বর্ণপ্রথা বলে কোনো ধারণই আমাদের সংস্কৃতি জানে না। আমাদের বর্ণাশ্রম ধর্ম ছিলো। আশ্রম' অর্থ যা আশ্রয় দেয়, আর 'বর্ণ' শব্দের মূল অর্থ বরণ করা। আশ্রম জীবনকে বরণ করে নেওয়াই ধর্ম বলে বিবেচিত হতো।
'বর্ণ' শব্দটি এসেছে 'বৃ' (বরণ করা বা বেছে নেওয়া) ধাতু থেকে। এর অর্থ হলো বৃত্তি, গুণ বা পেশা নির্বাচন করা। উপনয়নের পর গুরুকুলে শিক্ষা শেষে একজন ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা, মেধা এবং প্রবৃত্তি অনুযায়ী যে পেশা বা সামাজিক দায়িত্ব বরণ করে নিতেন, সেটাই ছিল তার 'বর্ণ'।
মানবজীবনের চারটি পর্যায়ে (ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস) মানুষ যে নির্দিষ্ট নিয়মানুবর্তিতা এবং শ্রমের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে, তাকেই আশ্রম বলা হতো।
আমরা আজ যে 'Caste System' বা জাতিভেদ প্রথার কথা বলি, তার উৎপত্তি আসলে পর্তুগিজ শব্দ 'Casta' থেকে, যার অর্থ বংশ, প্রজাতি বা Lineage। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক কাজ ও আদমশুমারির সুবিধার্থে প্রাচীন ভারতের এই পরিবর্তনশীল বর্ণাশ্রম ব্যবস্থাকে একটি অত্যন্ত অনড় ও কট্টর জাতিভেদে পরিণত করা হয়। যার প্রভাব সেই সময়ে সমাজের ওপর পড়েছিল। অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ পড়াশুনা করতে পারে, শিক্ষা দিতে পারে, এবং সম্মান কেবল ব্রাহ্মণ বা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের। সেই Colonial Hangover আজও অনেক ব্রাহ্মণদের মধ্যে দেখা যায়। সেটা তাঁদের কুশিক্ষার ফল। বেদ বা শাস্ত্র কি বলছে? অধুনিক শিক্ষিত সমাজের কুখ্যাত হিন্দু ধর্ম শাস্ত্র মনুস্মৃতি থেকেই কিছু উদাহরণ দিচ্ছি শুনুন—
ন হীনাঙ্গমতীরিক্তাঙ্গং বিদযাহীনং বয়োঽধিকম্ ।রূপদ্রবিণহীনং চ জাত্যা হীনং চ ক্ষিপেৎ ॥ (৪/১৪১)
অর্থ: কোনো অঙ্গহীন (প্রতিবন্ধী), অতিরিক্ত অঙ্গবিশিষ্ট, শিক্ষাহীন, বয়োবৃদ্ধ, রূপহীন, দরিদ্র অথবা জন্মসূত্রে তথাকথিত নিম্নবর্ণের (জাত্যা হীনং) মানুষকে কখনো উপহাস, কটূক্তি বা অবজ্ঞা করবে না।
অর্থ: কোনো শূদ্র যদি বাড়িতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন, তবে গৃহস্বামী অত্যন্ত সৌজন্যের সাথে তাঁর কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করবেন এবং মানবিকতার খাতিরে (আনৃশংস্য) তাঁকে সশ্রদ্ধে ভোজন করাবেন।
তাহলে প্রশ্ন আসবে, মনু স্মৃতির ওই সকল বক্তব্য গুলো কি, যেখানে শূদ্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত ও অপমান করা হয়েছে? যেমন নিচের উদাহরণ গুলো দেখুন:
৮/২৭০ নম্বর শ্লোক: একজন শূদ্র যদি দ্বিজদের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) কটু কথা বলে বা অপমান করে, তবে তার জিভ কেটে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৮/২৭১ নম্বর শ্লোক: শূদ্র যদি অহংকারবশত উচ্চবর্ণের মানুষের নাম ও জাত তুলে গালি দেয়, তবে দশ আঙুল লম্বা জ্বলন্ত লোহার শিক তার মুখে প্রবেশ করানোর কথা বলা হয়েছে।
৪/৮০ নম্বর শ্লোক: ব্রাহ্মণদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন কোনো শূদ্রকে আধ্যাত্মিক উপদেশ বা ব্রত পালনের নিয়ম না শেখায়।
৮/২৭২ নম্বর শ্লোক: একজন শূদ্র যদি ব্রাহ্মণকে ধর্মোপদেশ দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়, তবে রাজার উচিত তার মুখ ও কানে ফুটন্ত তেল ঢেলে দেওয়া।
১০/১২৯ নম্বর শ্লোক: এই শ্লোকে বলা হয়েছে, একজন শূদ্র যদি ধন উপার্জনে সক্ষমও হয়, তবুও সে যেন অতিরিক্ত ধন সঞ্চয় না করে। কারণ, শূদ্র ধনবান হলে সে অহংকারী হয়ে ব্রাহ্মণদের কষ্ট দিতে পারে। অর্থাৎ, শূদ্রের অর্থনৈতিক উন্নতির পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
১/৯১ নম্বর শ্লোক: এখানে বলা হয়েছে, সৃষ্টিকর্তা শূদ্রদের জন্য কেবল একটিই কর্ম নির্ধারণ করেছেন— আর তা হলো, কোনো রকম অহংকার বা ঈর্ষা ছাড়া উপরের তিন বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) সেবা করা। পণ্ডিতদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমানে মনুস্মৃতির ২৬৮৫টি শ্লোকের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শ্লোক (প্রায় ১৪৭০টি) পরবর্তীকালে যুক্ত করা হয়েছে (প্রক্ষিপ্ত)।
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী, ড. সুরেন্দ্র কুমার, ড. বি. আর. আম্বেদকর) গবেষণায় এই স্ববিরোধিতার পেছনের আসল সত্যটি উঠে এসেছে: বর্তমানে আমরা যে মনুস্মৃতি পড়ি, তা মহর্ষি মনুর নিজের হাতে লেখা কোনো মূল পাণ্ডুলিপি নয়। হাজার হাজার বছর ধরে এটি মৌখিক বা হাতে লেখা অবস্থায় টিকে ছিল। পণ্ডিতদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমানে মনুস্মৃতির ২৬৮৫টি শ্লোকের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শ্লোক (প্রায় ১৪৭০টি) পরবর্তীকালে যুক্ত করা হয়েছে (প্রক্ষিপ্ত)।
মনুস্মৃতিতেই যখন বলা হচ্ছে যে "ব্রাহ্মণ তার কর্ম ও আচরণে ভ্রষ্ট হলে শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হয়"। সেই বক্তব্য উপেক্ষা করে এই আরোপ গুলো কিভাবে আপনি মেনে নিতে পারছেন যে কথাগুলো বর্ণাশ্রম প্রথায় "জাত" (Caste) বা জন্মভিত্তিক বৈষম্য? এখানে 'শূদ্রত্ব' প্রাপ্ত হওয়া মানে সমাজের চোখে 'অস্পৃশ্য' বা 'নিচুজাত' হয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী একটি ভিন্ন পেশা বা বৃত্তি বেঁছে নেওয়া।
এই সকল যদি আপনার বৈষম্য বলে মনে হয়, তবে মনুস্মৃতিতে এমন একটি নির্দিষ্ট অপরাধের কথা উল্লেখ আছে, যেখানে শূদ্রের তুলনায় ব্রাহ্মণকে সবচেয়ে কঠোর এবং বহুগুণ বেশি শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই অপরাধটি হলো— চুরি (Theft)।
মনুস্মৃতির ৮ম অধ্যায়ের ৩৩৭ এবং ৩৩৮ নম্বর শ্লোকে চুরির শাস্তির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:
অষ্টাপাদ্যং তু শূদ্রস্য স্তেয়ে ভবতি কিল্বিষম্ । ষোড়শৈব তু বৈশ্যস্য দ্বাত্রিংশৎ ক্ষত্রিয়স্য চ ॥ (৮/৩৩৭)ব্রাহ্মণস্য চতুষ্ষষ্টিঃ পূর্ণং বাপি শতং ভবেৎ । দ্বিগুণা বা চতুষ্ষষ্টিস্তদ্দোষগুণবিদ্ধি সঃ ॥ (৮/৩৩৮)
মনুস্মৃতি ১১/৯১ এবং ৯/২৩৭ : কোনো ব্রাহ্মণ জেনেশুনে সুরা বা মদ পান করলে, প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তাকে ফুটন্ত গরম মদ, জল, গোমূত্র বা দুধ পান করতে হবে। পান করতে করতে মৃত্যুবরণ করাই হলো তার প্রায়শ্চিত্ত। রাজা বিচার করে অপরাধী মদ্যপ ব্রাহ্মণের কপালে উত্তপ্ত লোহা দিয়ে 'মদের পাত্র' বা 'শুঁড়িখানার চিহ্ন' (ধ্বজা) চিরকালের জন্য এঁকে দেবেন। অর্থাৎ ভেবে দেখুন, আজীবন সে জীবিত থেকেই তিল তিল করে মরবে। এর থেকে তো মৃত্যু দণ্ড ভালো। তাই না? মনুস্মৃতি ৯/২৩৭ বলছে গুরুপত্নী বা সম্মানীয় কারো স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করলে, সেই অপরাধী ব্রাহ্মণের কপালে উত্তপ্ত লোহা দিয়ে 'যোনিচিহ্ন' বা 'ভগচিহ্ন' খোদাই করে দেওয়া হবে।
মনুস্মৃতি ৯/২৩৮ - ৯/২৩৯ বলছে: কলঙ্কচিহ্নযুক্ত এই ব্রাহ্মণকে কেউ নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে পারবে না, তার সাথে কেউ কথা বলতে, আহার করতে বা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না। তাকে সম্পূর্ণ সমাজচ্যুত করা হবে। আশারাম, রামরহিমের মতো ভন্ড বাবাজিদের দেখিয়ে হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ সমাজের প্রতি যে বিদ্রুপ ও আক্রমণ করা হয়। সেটাও ভিত্তিহীন। কারণ, এরা তো ব্রহ্মণও নয়।
•#############################
• আশারাম বাপুর জন্ম ১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতের সিন্ধু প্রদেশে (বর্তমান পাকিস্তান)। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার গুজরাটে চলে আসে। তিনি কোনো ব্রাহ্মণ বা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত পরিবার থেকে আসেননি, তিনি ছিলেন সিন্ধি ব্যবসায়ী। আধ্যাত্মিক গুরু হওয়ার আগে তিনি সাইকেল মেরামত, চা বিক্রি এবং মদের ব্যবসাও করতেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে 'সন্ত' বলে দাবি করেন এবং ১৯৭০-এর দশকে গুজরাটের মোতেরায় নিজের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
• গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের জন্ম ১৯৬৭ সালে রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগর জেলায় একটি জাঠ শিখ (কৃষক) পরিবারে। অর্থাৎ, তিনিও জন্মগতভাবে ব্রাহ্মণ বা সনাতন ধর্মশাস্ত্রের কোনো পরম্পরাগত গুরু নন। ১৯৯০ সালে তিনি 'ডেরা সাচ্চা সওদা' নামক একটি আধ্যাত্মিক সংগঠনের প্রধান হন। এটি কোনো নির্দিষ্ট হিন্দু বা শিখ সংগঠন নয়, বরং এটি একটি মিশ্র কাল্ট। নিজেকে তিনি আধ্যাত্মিক গুরু, সমাজসংস্কারক, গায়ক এবং সিনেমার নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর বিশাল রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রতিপত্তি ছিল। নিজের আশ্রমের নারী ভক্তদের (সাধ্বী) ধর্ষণ এবং সত্য প্রকাশ করার চেষ্টায় এক সাংবাদিককে (রাম চন্দ্র ছত্রপতি) হত্যার অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। বর্তমানে তিনিও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
•#############################
তাই বর্ণাশ্রম কোনোভাবেই কোনো বিভেদকামী বা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ছিল না। এটি ছিল মূলত সমাজ ও ব্যক্তির সামগ্রিক বিকাশের জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল জীবন-কাঠামো (Socio-spiritual framework)।
আধুনিক 'আবাসিক বিদ্যালয়' বা Boarding School
প্রাচীনকালের এই গুরুগৃহের শিক্ষা ব্যবস্থা আজকের যুগের আবাসিক বিদ্যালয় বা Boarding School-এর সাথে সম্পূর্ণ তুলনীয়। কিন্তু অধুনিক আবাসিক বিদ্যালয়ে ছাত্ররা সেই নৈতিক শিক্ষা পায় না। ছাত্ররা সেখানে একসাথে থাকত, সমবেতভাবে নিয়মকানুন শিখত এবং গুরুর তত্ত্বাবধানে থেকে নিজেদের চরিত্র গঠন করত।
নারী ও উপনয়ন প্রসঙ্গ
প্রাচীন বৈদিক যুগে (যেমন ঋগ্বেদের আমলে) নারীদেরও উপনয়ন হতো এবং তারা ‘ব্রহ্মবাদিনী’ হিসেবে গুরুগৃহে শিক্ষা লাভ করতেন (যেমন: গার্গী, মৈত্রেয়ী)।
তবে পরবর্তীকালে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এবং কন্যা সন্তানদের আবাসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হওয়ায়, নারীদের এই ব্যবস্থা থেকে বাইরে রাখা হয়। ফলস্বরূপ, নারীদের জন্য বিবাহকেই মূল সামাজিক সংস্কার হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে।
শেষ কথা (Conclusion)
কালের নিয়মে আজ প্রাচীন আশ্রম জীবন ও শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটেছে। নিজগৃহে শিক্ষা বা আধুনিক স্কুল-কলেজের বিকল্প ব্যবস্থা এলেও, উপনয়ন আজ সনাতন ধর্মের একটি অন্যতম প্রধান সংস্কার হিসেবে টিকে রয়েছে। অন্ধবিশ্বাস বা অলৌকিকতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা এর মূল ভাবার্থটি বোঝার চেষ্টা করি, তবে দেখা যাবে উপনয়ন আসলে এক সুশৃঙ্খল, নীতিবান এবং মূল্যবোধসম্পন্ন জীবনপদ্ধতি বা জীবনশৈলীর সূচনা মাত্র।
প্রাচীন উপনয়ন ব্যবস্থার এই বাস্তবসম্মত ও আধুনিক ব্যাখ্যাটি আপনার কেমন লাগল? আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন