আমরা সাধারণত ধরে নিই যে, যীশু খ্রীষ্টই খ্রীষ্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু ইতিহাসের পাতা এবং খোদ বাইবেলের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলো ঘাঁটলে বেরিয়ে আসে এক ভিন্ন এবং চমকপ্রদ চিত্র। আধুনিক ইতিহাসবিদ এবং ধর্মতাত্ত্বিকরা আজ এই বিষয়ে একমত যে, যীশু কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে আসেননি, বরং তাঁকে ঘিরেই পরবর্তীতে একটি নতুন ধর্মের জন্ম হয়েছিল। কিভাবে একটি ছোট্ট ইহুদী সম্প্রদায়ের শাখা বা ইহুদী উপদল বিশাল একটি ধর্ম সংগঠন হয়ে গেলো, আসুন জেনে নেই সেই অসাধারণ তথ্যভিত্তিক আলোচনা।
আমি একজন সনাতনী হিন্দু, আমি একজন ভারতীয় খ্রীষ্টান পরিবারে মেয়েকে বিয়ে করেছি। আমাদের বিয়ে হয়েছে আজ দুই বছর হতে চলল। এই দুই বছরে আমি আমার শশুর বাড়ির বিভিন্ন উৎসবে যোগদান করে খ্রীষ্ট ধর্ম সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আমার স্ত্রীর মা বাবা জন্ম সূত্রে খ্রিস্টান ছিলেন না। তাদের পরিবার যখন রোগ ও শোকের মধ্য দিন যাচ্ছিল, সেই সময়ে একজন খ্রিস্টান মিশনারি তাদের বাড়ি এসে আশ্বাস ও প্রার্থনা করে একটি কৌশলে ধর্মান্তরিত করেছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারে যুক্ত হয়ে আমি দুটি ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থাকে খুব কাছ থেকে দেখার এবং তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার সুযোগ পেয়েছি, যা আমার এই চিন্তাধারাকে স্পষ্ট করেছে।
যেখানে এক দিক থেকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য কুটিল মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের অবলম্বন করা হচ্ছে। এই জায়গায় আমাদের সনাতন ধর্ম হেরে যায়। আমরা জাত, পাত, বর্ণ নিয়ে অজ্ঞ এবং তাই ধর্ম জ্ঞানের ও শ্রেষ্ঠত্বে দাম্ভিকতা দেখাই। কিন্তু আসলে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি রক্ষা করতে জানি না। একজন মানুষ যখন অসুস্থতা বা দারিদ্র্যে পড়ে দিশেহারা হন, তখন তাঁর কাছে 'ব্রহ্ম সত্য' বা 'জন্মান্তরবাদ'-এর চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়ায় এক গ্লাস জল বা একটু সহমর্মিতা। মিশনারিরা সেই 'ইমোশনাল স্পেস' দখল করে নেয়।
যখন কোনো প্রান্তিক মানুষ মন্দির বা সমাজে বর্ণভেদের কারণে অপমানিত হয়, তখন মিশনারিরা এসে তাকে বলে— "আমাদের ধর্মে সবাই এক, যীশুর কাছে কোনো উঁচু-নিচু নেই।" যদিও খ্রীষ্টধর্মের ভেতরেও ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট বা বর্ণভেদ আছে, কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় তারা যে 'সামাজিক মর্যাদা' (Social Dignity) উপহার দেয়, তা একজন অবহেলিত মানুষের কাছে স্বর্গীয় মনে হয়।
সনাতন ধর্মে 'সেবাশ্রম' বা 'মঠ' থাকলেও সাধারণ গৃহস্থ হিন্দুদের মধ্যে একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে সাংগঠনিক ঐক্য, তা তুলনামূলক কম। এই বিচ্ছন্নতাই মিশনারিদের জন্য পথ তৈরি করে দেয়। তাই শুধু মঠ বা সেবাশ্রমের আশায় বসে থাকলে হবে না। সাধারণ গৃহস্থ হিন্দুদের আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, "খালি পেটে ধর্ম হয় না।" আজ যদি হিন্দু সমাজ জাতপাত ভুলে প্রতিটি বিপন্ন মানুষের পাশে এসে দাঁড়াত, তবে কোনো মিশনারি তার "আশ্বাস" নিয়ে প্রবেশের সুযোগ পেত না। তাই "শাস্ত্রে জ্ঞান দিয়ে নয়, মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমে ধর্ম টিকে থাকে।"
যীশু খ্রীষ্টের কোনো দোষ নেই!
খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার এবং প্রসারে যীশু খ্রীষ্টের অবদান নেই। তাই হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পেছনে যীশু খ্রীষ্টের কোনো দোষ নেই! যীশু খ্রীষ্টকে ধর্মপ্রচারকেরা একটি প্রোডাক্ট হিসাবে ব্যবহার করে মাত্র। এর জন্য পর্যায় ক্রমে ইতিহাসকে জানতে হবে।
যীশুর অস্তিত্বে বিশ্বাস
আমাদের মধ্যে অনেকেই যীশুর অস্তিত্ব নিয়েও অনেকে সন্দেহ করেন। অথচ যীশু খ্রীষ্টের একজন বাস্তব ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বিশ্বাসের যীশু আর ঐতিহাসিক যীশু খ্রীষ্ট একদম আলাদা।
ঐতিহাসিক, যীশু খ্রীষ্ট জন্মসূত্রে এবং তাঁর জীবনযাপন ছিল একজন আদ্যোপান্ত ইহুদী। অষ্টম দিনে তাঁর খতনা (Circumcision) থেকে শুরু করে, ইহুদী জাতির ঈশ্বরের উপাসনা, ইহুদী উৎসব যেমন : 'পাসওভার' পালন—সব কিছুতেই তিনি ছিলেন একজন ইহুদী।
তাঁর মূল উদ্দেশ্য ইহুদী ধর্মকে বাতিল করা ছিল না, বরং এর ভেতরের কুসংস্কার ও বাহ্যিক আড়ম্বর দূর করে আত্মিক সংস্কার সাধন করা।
মথি রচিত সুসমাচারে (Matthew 5:17) যীশু নিজেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন:
"তোমরা মনে করো না যে আমি মোশির শরীয়ত কিংবা নবীদের শিক্ষা বাতিল করতে এসেছি; আমি বাতিল করতে আসিনি, বরং তা (যা ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছিলো ) পূর্ণ করতে এসেছি।"
যীশু কখনো তাঁর অনুসারীদের ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে নতুন কোনো "খ্রীষ্টান" পরিচয় ধারণ করতে বলেননি। যীশু নিজেই তাঁর মিশনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বলেছেন:
"আমি কেবল ইস্রায়েল-কুলের হারানো মেষদের কাছেই প্রেরিত হয়েছি।" (মথি ১৫:২৪ পদে)
রাজনীতির ময়দানে যীশু
যীশুর মৃত্যুর পর সেন্ট পল (Saint Paul) এবং অন্যান্য শিষ্যরা তাঁর বাণী ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেন। মূলত পল-ই ইহুদী গণ্ডির বাইরে গিয়ে অ-ইহুদীদের (Gentiles) মধ্যে এই ধর্ম প্রচারের প্রধান রূপকার ছিলেন। কালক্রমে রোমান সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় মিশনারিদের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রচারের প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই যীশুর মূল শিক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে প্রচার করা হয়েছে।
যিশুই একমাত্র জীবিত ঈশ্বর, মুক্তির পথ।
ইহুদী এবং খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে "জীবিত ঈশ্বর" কথাটির মূলত দুটি অর্থ আছে। এটি আসলে পৌত্তলিকতার সরাসরি বিরোধিতা। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদীদের চারপাশের জাতিগুলো কাঠ, পাথর বা ধাতুর তৈরি মূর্তির পূজা করত। ইহুদী এবং পরবর্তীতে খ্রিস্টানদের কাছে ওই মূর্তিগুলো ছিল "মৃত" (যারা দেখতে, শুনতে বা কাজ করতে পারে না)। এর বিপরীতে তারা তাদের ঈশ্বরকে বলত "জীবিত ঈশ্বর"—যিনি সক্রিয়, যিনি মানুষের ইতিহাসে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন এবং কথা বলেন।
তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর প্রথম মানুষ আদমের সাথে কথা বলেছেন, তাদের জাতির পিতা আব্রাহামের সাথে চুক্তি (Covenant) করেছেন। ইহুদিদের ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী বা নিষ্ক্রিয় স্রষ্টা (Deist God) নন যিনি জগত সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি একজন 'ঐতিহাসিক ঈশ্বর', যিনি প্রতিনিয়ত মানব ইতিহাসে, বিশেষ করে ইহুদিদের জাতীয় ইতিহাসে হস্তক্ষেপ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়। তখন ইহুদিদের নিজেদের ভেতরেই হাহাকার উঠেছিল। সেই প্রসঙ্গে যদি প্রশ্ন করা হয় "ঈশ্বর তখন কী করছিলেন?" এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর ইহুদিদের কাছে আছে কি?
সেই ইহুদী জাতির উদ্ধারের জন্য যীশু তাঁর অনুসারীদের শিক্ষা দিতেন। যীশু কেবল ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষাই দিচ্ছিলেন না, তিনি তৎকালীন ইহুদী পুরোহিতদের (ফ্যারিসি এবং স্যাডিউসি) ভণ্ডামি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিচ্ছিলেন। তাই তিনি ফ্যারিসি এবং স্যাডিউসি দের শত্রু হয়ে ওঠেন।
তাঁর সঙ্গে শত্রুতার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল জেরুজালেমের মন্দিরে। তৎকালীন ফ্যারিসি এবং স্যাডিউসি ধর্মকে ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়েছিল। যীশু যখন মন্দিরের ভেতর থেকে ব্যবসায়ীদের টেবিল উল্টে দিয়ে তাদের তাড়িয়ে দেন, তখন তিনি সরাসরি তাদের ক্ষমতার কেন্দ্র এবং অর্থনীতিতে আঘাত করেছিলেন। তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে যীশুকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তারা সেখানকার রাজা পিলাতের কাছে নালিশ জানান।
পিলাতের নতি স্বীকার:
পিলাত জানতেন যীশু নির্দোষ, তবুও তিনি কেন নতি স্বীকার করলেন? এর কারণ ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। তখন চলছিল ইহুদীদের 'পাসওভার' (Passover) উৎসব, ফলে জেরুজালেম শহর তীর্থযাত্রীতে লোকারণ্য ছিল। পুরোহিতরা উসকানি দিয়ে জনতাকে খেপিয়ে এমন এক দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যে, পিলাত যদি যীশুকে ছেড়ে দিতেন, তবে সেখানে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ বেধে যেত। রোমান সাম্রাজ্যে কোনো গভর্নরের এলাকায় দাঙ্গা হওয়া মানে সম্রাটের কাছে তার অযোগ্যতা প্রমাণ হওয়া এবং ফলস্বরূপ চাকরি বা গর্দান যাওয়া। তাই নিজের পদ, ক্ষমতা এবং রোমান শান্তি (Pax Romana) বজায় রাখতে পিলাত একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনকে বলি দিয়েছিলেন।
ইহুদী পুরোহিতদের আদালতে (যাকে 'স্যানহেড্রিন' বলা হতো) যীশুর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল 'ব্লাসফেমি' বা ঈশ্বরনিন্দা (যেহেতু তিনি নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র দাবি করেছিলেন)।
কিন্তু তারা জানত, রোমান গভর্নর পিলাত ইহুদীদের ধর্মীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে মাথা ঘামাবেন না এবং এর জন্য মৃত্যুদণ্ডও দেবেন না। পিলাত আসলে কোনো "রাজা" ছিলেন না। তিনি ছিলেন রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের অধীনস্থ যিহূদিয়া (Judea) প্রদেশের 'রোমান গভর্নর' বা 'প্রিফেক্ট'। তাই তারা পিলাতের কাছে যাওয়ার সময় অভিযোগটি সম্পূর্ণ পালটে একটি রাজনৈতিক রূপ দেয়। তারা অভিযোগ করে যে, যীশু নিজেকে "ইহুদীদের রাজা" (King of the Jews) বলে দাবি করছেন এবং রোম সম্রাট সিজারকে কর দিতে বারণ করে বিদ্রোহের উসকানি দিচ্ছেন। রোমান আইনের চোখে এটি ছিল সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
ইহুদী আইনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো পাথর ছুঁড়ে (Stoning) মেরে। কিন্তু ক্রুশবিদ্ধ করা ছিল রোমানদের একটি ভয়ংকর এবং অপমানজনক শাস্তি, যা কেবলমাত্র রাষ্ট্রদ্রোহী, বিদ্রোহী দাস বা চরম অপরাধীদের দেওয়া হতো মানুষের মনে ভয় ঢোকানোর জন্য। অর্থাৎ, আপনার বর্ণনার সূত্র ধরেই বলা যায়—যীশুর মৃত্যু কোনো নিখাদ আইনি বা ধর্মীয় বিচার ছিল না।
কেউ যীশুর পক্ষ নেয়নি।
যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় তাঁর নিজের শিষ্যরাই ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যীশুর এই মাথা পেতে শাস্তি নেওয়াটা অনুসারীদের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। প্রাচীন ইহুদী ধর্মগ্রন্থ 'ইসাইয়া' (Isaiah)-তে একজন "কষ্টভোগী সেবক" (Suffering Servant)-এর কথা বলা ছিল, যিনি নীরবে অন্যের পাপের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। যীশুর এই আত্মত্যাগ তাঁর অনুসারীদের কাছে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
যীশুর মৃতদের মধ্যে জীবিত হয়েছেন।
মৃত্যুর তিন দিন পর তাঁর কবর খালি পাওয়া এবং তাঁর পুনরুত্থান বা ফিরে আসার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, অনুসারীদের এই গভীর মানসিক ট্রমা এবং তীব্র বিশ্বাস থেকেই পুনরুত্থানের ধারণাটি প্রবল হয়ে ওঠে, যা তাদের নতুন করে সংগঠিত হতে সাহায্য করে।
প্রথম দিকের এই অনুসারীরা নিজেদের কখনোই 'খ্রীষ্টান' বলত না, তারা কোনো নতুন ধর্মও বানায়নি। বাইবেলের 'বুক অফ অ্যাক্টস' (Acts of the Apostles)-এ তাদের উল্লেখ করা হয়েছে "The Way" (পথ) হিসেবে।
- তারা তখনও সিনাগগে যেত।
- ইহুদী আইন মেনে চলত।
- তাদের কাছে যীশু তখনো ঈশ্বর ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মহান ইহুদী নবী এবং প্রতিশ্রুত 'মসীহ'।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়। আধুনিক খ্রীষ্ট ধর্মের রূপান্তর কিভাবে হয়েছে?
আধুনিক খ্রীষ্ট ধর্মের রূপান্তর কিভাবে হয়েছে?
আসলে রোমানরা ছিল চরমমাত্রায় 'বহু-ঈশ্বরবাদী' এবং পরমতসহিষ্ণু। তারা যখনই কোনো দেশ দখল করত, সেখানকার দেবতাদের নিজেদের প্যান্থিয়নে (Pantheon) সানন্দে জায়গা দিত। কিন্তু খ্রীষ্টানদের সাথে তাদের সংঘাতটা নিছক ধর্মীয় ছিল না, এর পেছনে ছিল দুটি অত্যন্ত গুরুত।
- প্যাক্স ডিওরাম (Pax Deorum) বা দেবতাদের শান্তি: রোমানরা বিশ্বাস করত যে তাদের সাম্রাজ্যের উন্নতি এবং স্থায়িত্ব নির্ভর করে দেবতাদের তুষ্ট রাখার ওপর। ইহুদীরা যখন রোমান দেবতাদের পূজা করতে অস্বীকার করল, রোমানরা ভয় পেল যে এতে দেবতারা রুষ্ট হবেন এবং সাম্রাজ্যে মহামারী বা খরা নেমে আসবে। তাই খ্রীষ্টানদের তারা 'নাস্তিক' (Atheist) বলত।
- সম্রাটের উপাসনা এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা: রোমান সাম্রাজ্যে সম্রাটকে 'ঈশ্বর' বা ঈশ্বরের প্রতিভূ মানা হতো এবং তাঁর মূর্তির সামনে সামান্য ধূপ জ্বালিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করাটা ছিল নাগরিকত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ (ঠিক যেমন এখনকার দিনে জাতীয় পতাকাকে সম্মান করা)।
ইহুদীদের যেহেতু অত্যন্ত প্রাচীন একটি ধর্ম ছিল, তাই রোমানরা তাদের এই নিয়ম থেকে আইনিভাবে ছাড় দিয়েছিল।
যীশুর মূল শিষ্যরা (যেমন পিটার বা জেমস) নিজেদের ইহুদীই মনে করতেন এবং তারা এই আইনি সুরক্ষার ছায়াতেই ছিলেন। কিন্তু সেন্ট পল যখন ঘোষণা করলেন যে খ্রীষ্টান হতে গেলে ইহুদী হতে হবে না (খতনা বা ইহুদী আইন মানতে হবে না), তখন তিনি মূলত খ্রীষ্টধর্মকে ইহুদী ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিলেন। এর ফলে খ্রীষ্টানরা রাতারাতি রোমানদের চোখে তাদের "বৈধ ধর্মের" আইনি সুরক্ষাটি হারিয়ে ফেলে এবং একটি অবৈধ ও বিপজ্জনক নতুন উপদল বা "Superstitio"-তে পরিণত হয়। পলের এই সিদ্ধান্তই তাদের রোমান আইনের সরাসরি শাস্তির মুখে ঠেলে দেয়।
রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় স্লোগান ছিল "সিজার ইজ লর্ড" (সম্রাটই প্রভু)। কিন্তু সেন্ট পল তাঁর প্রচার এবং চিঠিপত্রগুলোতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিদ্রোহী শব্দ ব্যবহার শুরু করেন— গ্রিক শব্দ "Kyrios" বা লর্ড। পল প্রচার করেন, "কেবলমাত্র যীশুই প্রভু (Kyrios)"। পলের এই শিক্ষাই সাধারণ খ্রীষ্টানদের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয় যে, যীশু ছাড়া অন্য কাউকে, এমনকি সম্রাটকেও "প্রভু" বলা যাবে না। পলের এই ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থানই খ্রীষ্টানদের রোমানদের চোখে "রাষ্ট্রদ্রোহী" প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় আইনি ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
পল কোনো সাধারণ গ্রাম্য প্রচারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন রোমান নাগরিক এবং গ্রিক দর্শনে শিক্ষিত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি ধর্মকে বিশ্বজনীন করতে হলে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করতে হবে। তাই তিনি সরাসরি রোমান সাম্রাজ্যের বড় বড় বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে (যেমন: ইফিষ, করিন্থ, থেসালোনিকি এবং খোদ রোমের বুকে) অত্যন্ত সুসংগঠিত চার্চের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। পলের এই আগ্রাসী এবং সুপরিকল্পিত বিস্তার কৌশল রোমান প্রশাসনকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে, এটি কেবল একটি সাধারণ ইহুদী মতবাদ নয়, এটি একটি সাম্রাজ্য-বিরোধী সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক।
সবশেষে, রোমানদের এই নিপীড়নের সাথে পলের নিজের জীবনের যোগসূত্র অত্যন্ত করুণ। যে রোমান সাম্রাজ্যে তিনি তাঁর ধর্ম বিস্তার করেছিলেন, সেই রোমান সম্রাট নিরোর (Nero) কোপানলেই তাঁকে পড়তে হয়। রোমে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নিরো যখন খ্রীষ্টানদের বলির পাঁঠা বানান, তখন সেই দমনপীড়নের অংশ হিসেবে সেন্ট পলকেও রোমে গ্রেপ্তার করা হয় এবং শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সেন্ট পল খ্রীষ্টধর্মকে যে "বিশ্বজনীন" রূপ দিয়েছিলেন, ঠিক সেই রূপটিই তাদের রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রের এক নম্বর শত্রুতে পরিণত করেছিল। পলের ধর্মতত্ত্বই ছিল খ্রীষ্টানদের সেই অদম্য সাহসের উৎস, যার জন্য তারা হাসিমুখে কলোসিয়ামের পশুদের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুবরণ করতে পেরেছিল।
কিন্তু সেন্ট পল, যিনি যীশুকে তাঁর জীবদ্দশায় কখনো দেখেননি, তিনি এই ধর্মে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। পলই প্রথম দাবি করেন যে, যীশুর বার্তা কেবল ইহুদীদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যীশুর অনুসারী হতে হলে কাউকে ইহুদী হতে হবে না বা ইহুদীদের কঠিন নিয়মকানুন মানতে হবে না। পল নিজেকে "অ-ইহুদীদের প্রেরিত দূত" হিসেবে ঘোষণা করেন।
পল তাঁর 'গালাতীয়দের কাছে লেখা পত্রে' (Galatians 3:28) যীশুর ইহুদী-কেন্দ্রিক মিশনের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি বিশ্বজনীন ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন:
"এখানে ইহুদী বা গ্রীক (অ-ইহুদী) বলে কেউ নেই, দাস বা স্বাধীন বলে কেউ নেই, পুরুষ বা নারী বলে কেউ নেই; কারণ খ্রীষ্ট যীশুতে তোমরা সবাই এক।"
পলের এই সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারাই একটি ছোট ইহুদী সংস্কার আন্দোলনকে রোমান সাম্রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পথ তৈরি করে দেয়।
রোমান সাম্রাজ্যে বহু দেবতার পূজা হতো এবং সম্রাটকে ঈশ্বর মানা হতো। কিন্তু খ্রীষ্টানরা যীশু ছাড়া আর কাউকেই উপাসনা করতে রাজি ছিল না। রোমানদের চোখে এটি কোনো ধর্মীয় অপরাধ ছিল না, এটি ছিল সরাসরি "রাষ্ট্রদ্রোহিতা" বা Political Treason। এই কারণেই রোমানরা তাদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন চালায়।
ভারতে যাঁরা ধর্মান্তরিত হন, তাঁদের একটি বড় অংশ ধর্মতত্ত্ব বা ঐতিহাসিক যীশু সম্পর্কে গবেষণা করে ধর্মান্তরিত হন না। তাঁরা ধর্মান্তরিত হন মূলত সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক সুবিধা, চিকিৎসা, শিক্ষা অথবা এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তার খোঁজে। প্রান্তিক বা অবহেলিত মানুষ যখন কোনো মিশনারির কাছে সহমর্মিতা বা সম্মান পান, তখন যীশু খ্রীষ্ট ঐতিহাসিকভাবে কে ছিলেন, আর সেন্ট পল কী করেছিলেন—এই একাডেমিক বিতর্কগুলো তাঁদের কাছে একেবারেই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
ধর্ম মানুষের আবেগের জায়গা। মিশনারিরা যখন প্রচার করেন, তখন তাঁরা ঐতিহাসিক ডেটা বা পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসেন না; তাঁরা আসেন 'পাপ থেকে মুক্তি', 'অলৌকিক আরোগ্য' বা 'ঈশ্বরের অসীম ভালোবাসার' প্রতিশ্রুতি নিয়ে। একজন সাধারণ মানুষ যখন জীবনের কষ্টে জর্জরিত, তখন তার কাছে আবেগের এই সান্ত্বনাটুকু ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খণ্ডনমূলক যুক্তির (Refutation) পাশাপাশি একটি ইতিবাচক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শক্তিশালী নিজস্ব দর্শন মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, বেদান্ত দর্শনের সেই উপসংহারের কথা ভাবুন, যেখানে পর্যবেক্ষক ও ঈশ্বরের মধ্যকার সব দ্বৈততা বা ভেদবুদ্ধি শেষ পর্যন্ত এক অখণ্ড সত্তায় বিলীন হয়ে যায়। এই চূড়ান্ত ঐক্যের ধারণাটি যদি শুধু বইয়ের পাতায় না রেখে সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে মানুষ আর বাইরে কোনো 'ত্রাণকর্তা' খুঁজবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন নিজস্ব সমাজের ভেতরে সেই আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার বলয় তৈরি করা, যা মিশনারিরা বাইরে থেকে এসে দিচ্ছে।
খ্রিস্টধর্ম (এবং ইসলামও) হলো Exclusivist বা 'স্বতন্ত্রতাবাদী' ধর্ম। এদের মূল কাঠামোই দাঁড়িয়ে আছে এই ধারণার ওপর যে সত্য কেবল একটি এবং তা একটি নির্দিষ্ট রূপেই প্রকাশিত।
বাইবেলের যোহন (John) ১৪:৬ আয়াতে যীশুর নামে বলা হয়েছে, "আমিই পথ, সত্য ও জীবন; আমার মধ্যে দিয়া না আসিলে কেহ পিতার নিকটে আইসে না।" খ্রিস্টধর্ম এই বাক্যটিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছে।
তাদের ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, প্রথম মানুষ আদম ও ইভের পাপের কারণে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে যায়। মানুষের নিজের কোনো যোগ্যতা নেই সেই পাপ খণ্ডন করার। তাদের বিশ্বাস, ঈশ্বর নিজেই যীশুর রূপ ধরে এসে নিজের রক্ত দিয়ে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। যেহেতু এই "কুরবানি" বা আত্মত্যাগ কেবল যীশুই করেছেন, তাই তাদের কাঠামো অনুযায়ী মুক্তির দ্বিতীয় কোনো "Option" বা বিকল্প নেই। তাহলে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন
যাঁরা যীশুর নাম শোনেননি, তাঁদের মুক্তির কী হবে?—এই প্রশ্নটি দীর্ঘকাল ধরে দার্শনিকদের ভাবিয়েছে। কারণ যীশুর প্রাথমিক বার্তা অ-ইহুদীদের জন্য ছিলই না। তাহলে এই ধর্ম সারা বিশ্বে ছড়ালো কীভাবে? এখানেই প্রবেশ করেন ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব— সেন্ট পল।
'বিশ্বাসের খ্রীষ্টের' আড়ালে লুকিয়ে থাকা 'ঐতিহাসিক যীশু'-কে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে হাজার হাজার বছর আগের কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক দলিলের দিকে। এগুলো অনেকটা টাইম মেশিনের মতো কাজ করে। আসুন জেনে নিই এই যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো সম্পর্কে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ইসরায়েলের মৃত সাগরের উত্তর-পশ্চিম তীরের কুমরান (Qumran) গুহাগুলোতে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপির এক বিশাল সংগ্রহ পাওয়া যায়। এগুলো খ্রীষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী থেকে খ্রীষ্টীয় ১ম শতাব্দীর মধ্যে লেখা। অর্থাৎ, এগুলো যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে এবং ঠিক তাঁর সমসাময়িক সময়ের দলিল!
প্রাচীন যুগান্তকারী পাণ্ডুলিপি
এই আবিষ্কারের আগে বাইবেলের সবচেয়ে পুরনো হিব্রু পাণ্ডুলিপি ছিল খ্রীষ্টীয় ১০ম শতাব্দীর। এই স্ক্রলগুলো আবিষ্কারের ফলে আমরা বাইবেলের পাঠ্যকে এক ধাক্কায় আরও ১০০০ বছর আগের প্রাচীন রূপে দেখার সুযোগ পেয়েছি। অর্থাৎ হাজার বছর ধরে হাতে লিখে কপি করার ফলে মানুষের দ্বারা যে সংযোজন বা বিয়োজন হয়েছিল, এই প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলো আমাদের সেই মূল সত্যের একদম কাছাকাছি নিয়ে যায়।
বাইবেল কোনো একটি একক বই হিসেবে আকাশ থেকে পড়েনি; এটি হাজার বছর ধরে বিভিন্ন লেখক কর্তৃক লিখিত পাণ্ডুলিপির সংকলন। প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
পুরাতন নিয়ম (Old Testament)
এটি মূলত হিব্রু ভাষায় লেখা। মৃত সাগরের স্ক্রল ছাড়াও 'অ্যালেপ্পো কোডেক্স' হিব্রুতে একে বলা হয় 'কেতের আরাম সোভা' (Keter Aram Tzova), যার অর্থ 'অ্যালেপ্পোর মুকুট' এবং 'লেনিনগ্রাদ কোডেক্স'। এটি সামুয়েল বেন ইয়াকুব (Samuel ben Jacob) নামক এক লিপিকার দ্বারা কপি করা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে তিনি এটি বেন আশের ঐতিহ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা অন্যান্য নির্ভুল পাণ্ডুলিপি থেকে কপি করেছেন। এটি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে অবস্থিত 'ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ রাশিয়া'-তে সংরক্ষিত আছে। ১৯২৪ সালে শহরটির নাম লেনিনগ্রাদ রাখা হয়েছিল, তাই এই পাণ্ডুলিপিটি 'লেনিনগ্রাদ কোডেক্স' নামে পরিচিতি পায়।
নতুন নিয়ম (New Testament):
যীশুর জীবনী ও সেন্ট পলের পত্রাবলি মূলত গ্রীক ভাষায় লেখা। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো কোডেক্স সিনাইটিকাস (Codex Sinaiticus) এটি খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ বাইবেল যা গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। এটি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে এবং কোডেক্স ভ্যাটিকানাস (Codex Vaticanus) খ্রীষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দীর একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বাইবেলের পাণ্ডুলিপি।
গবেষকরা বাইবেলের ৪টি সুসমাচার (Matthew, Mark, Luke, John) তাদের লেখার সময়কাল অনুযায়ী সাজিয়ে একটি অদ্ভুত বিবর্তন লক্ষ্য করেছেন:
মার্ক (Mark - লেখা হয়েছে যীশুর মৃত্যুর প্রায় ৩০-৪০ বছর পর): এখানে যীশু একজন অত্যন্ত মানবিক চরিত্র। তিনি কষ্ট পান, রাগ করেন এবং মৃত্যুর আগে ক্রুশে চিৎকার করে বলেন, "ঈশ্বর, তুমি কেন আমায় ত্যাগ করলে?" এখানে তাঁকে জন্মের আগে থেকে ঈশ্বর বলা হয়নি।
যোহন (John - লেখা হয়েছে যীশুর মৃত্যুর প্রায় ৬০-৭০ বছর পর): সময়ের সাথে সাথে যীশুর পরিচয় বড় হতে থাকে এবং সর্বশেষ লেখা যোহনের গসপেলে গিয়ে যীশুকে সরাসরি মহাজাগতিক 'লোগোস' বা 'ঈশ্বর' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে পরবর্তীতে যা যোগ করা হয়েছে
আগের তিনটি উদাহরণ ছাড়াও আরও কিছু বিখ্যাত অংশ রয়েছে, যেগুলো প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিগুলোতে (যেমন খ্রীষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দীর কোডেক্স সিনাইটিকাস বা ভ্যাটিকানাস) অনুপস্থিত।
যীশুর ঘাম রক্ত হয়ে ঝরে পড়া (Luke 22:43-44)
লুক লিখিত সুসমাচারে বলা হয়েছে, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার আগের রাতে যীশু যখন পাহাড়ে প্রার্থনা করছিলেন, তখন তিনি এতই মানসিক যন্ত্রণায় ছিলেন যে, স্বর্গ থেকে এক দূত এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর ঘাম রক্তের বিন্দুর মতো মাটিতে ঝরে পড়ে।
ইতিহাসবিদদের মত: প্রাচীনতম গ্রীক পাণ্ডুলিপিগুলোতে এই লাইন দুটি নেই। চতুর্থ শতাব্দীর বিখ্যাত পাণ্ডুলিপি কোডেক্স সাইনাইটিকাস (Codex Sinaiticus) এবং কোডেক্স ভ্যাটিকানাস (Codex Vaticanus)-এ এই অংশটি নেই। এছাড়াও প্রাচীন সিরিয়াক এবং কিছু ল্যাটিন সংস্করণেও এটি অনুপস্থিত। কিছু পাণ্ডুলিপিতে আবার এই আয়াতগুলোর চারপাশে asterisks বা obeli দেওয়া আছে, যা নির্দেশ করে যে লিপিকাররা এই অংশের প্রামাণিকতা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।
গবেষকদের ধারণা, ২য় বা ৩য় শতাব্দীতে যখন কিছু মানুষ দাবি করতে শুরু করে যে যীশু রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন না, কেবল একটি 'আত্মিক রূপ' ছিলেন, তখন যীশুর 'মানবিক কষ্ট' প্রমাণ করার জন্য কোনো লেখক এই অংশটি যুক্ত করেছিলেন।
বেথেসদার পুকুরে দূতের জল নাড়ানো (John 5:4)
যোহনের সুসমাচারে একটি গল্প আছে, যেখানে যীশু বেথেসদার পুকুরপাড়ে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীকে সুস্থ করেন। ৪র্থ পদে বলা আছে, স্বর্গের দূত এসে মাঝে মাঝে সেই পুকুরের জল নাড়িয়ে দিতেন এবং তখন যে আগে জলে নামত সে সুস্থ হয়ে যেত। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর বিখ্যাত পাণ্ডুলিপি কোডেক্স সাইনাইটিকাস (Codex Sinaiticus) এবং কোডেক্স ভ্যাটিকানাস (Codex Vaticanus)-এ এই অংশটি নেই। এছাড়াও প্রাচীনতম প্যাপিরাস পাণ্ডুলিপিগুলো (যেমন- P 66এবং P75, যা আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টাব্দের) এই পদটি ছাড়াই টেক্সটটি উপস্থাপন করে। প্রাচীন ল্যাটিন, সিরিয়াক এবং কপটিক সংস্করণের প্রাচীনতম কপিগুলোতেও এটি অনুপস্থিত।
ইতিহাসবিদরা বলেন : প্রাচীন কোনো পাণ্ডুলিপিতে এই ৪র্থ পদটি নেই। রোগীরা কেন পুকুরের ধারে বসে থাকত, সেই লোকজ বিশ্বাসটি ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তীতে কোনো কপিয়ার (Scribe) এটি মূল লেখার সাথে জুড়ে দেন। যোহন ৫:৩ পদে বলা হয়েছে যে পুকুরপাড়ে অনেক অন্ধ, খঞ্জ এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী শুয়ে থাকত। ৫ নম্বর পদে যীশু একজন রোগীকে জিজ্ঞেস করেন, সে সুস্থ হতে চায় কি না।
রোগী উত্তর দেয় যে, জল যখন আলোড়িত হয়, তখন তাকে পুকুরে নামিয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই। একজন সাধারণ পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে: রোগীরা কেন ওখানে শুয়ে ছিল? আর জলই বা কেন আলোড়িত হতো? এবং জল আলোড়িত হওয়ার সাথে সুস্থ হওয়ার সম্পর্ক কী? তৎকালীন সময়ে একটি লোকজ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্বর্গের দূত এসে জল নাড়িয়ে দেন এবং তখন যে প্রথম নামবে সে সুস্থ হবে। আরো মজার বিষয় হলো, প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দেখা গেছে যে, এখানে জলের স্তর নিয়ন্ত্রণের জন্য স্লুইস গেট (sluice gates) বা পাইপ ছিল। মানুষ যেহেতু তখন স্লুইস গেটের প্রযুক্তি সম্পর্কে জানত না, তাই তারা এই হঠাৎ জলের আলোড়নকে কোনো ঐশ্বরিক শক্তির (স্বর্গের দূত) কাজ বলে মনে করত। ও
'প্রভুর প্রার্থনা'-র শেষ লাইন (Matthew 6:13)
খ্রীষ্টানদের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রার্থনা হলো "The Lord's Prayer"। আধুনিক বাইবেলে মথি ৬:১৩ পদে প্রার্থনার শেষে লেখা আছে, "কারণ রাজ্য, পরাক্রম ও মহিমা যুগে যুগে তোমারই। আমেন।"
ইতিহাসবিদদের মত: প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিগুলোতে এই রাজকীয় সমাপ্তি বা 'Doxology' নেই। চার্চে উপাসনার সময় মানুষ প্রার্থনার শেষে ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন করত। চার্চের সেই মৌখিক প্রথাই একসময় লিখিত বাইবেলের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
বাবর্ণনার অসঙ্গতি সন্দেহ তৈরি করে
বাইবেলের ৪টি সুসমাচার (মথি, মার্ক, লুক, যোহন) যদি পাশাপাশি রেখে পড়া হয়, তবে এমন কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে যা থেকে বোঝা যায় এগুলো ভিন্ন ভিন্ন লেখকের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা।
যীশুর বংশতালিকা (The Genealogy of Jesus)
মথি এবং লুক—উভয় সুসমাচারেই যীশুর বংশতালিকা দেওয়া হয়েছে এবং দুজনেই যীশুকে রাজা দাউদের বংশধর হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু তালিকা দুটি মেলালে দেখা যায় বড় রকমের অমিল!
অসঙ্গতি: রাজা দাউদ থেকে যীশু পর্যন্ত আসতে মথি যেখানে রাজা শলোমনের বংশধারা ব্যবহার করেছেন, সেখানে লুক সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যক্তি (নাথন)-এর ধারা ব্যবহার করেছেন। এমনকি যীশুর আইনগত পিতা যোষেফের বাবার নামও দুজনের কাছে আলাদা (মথির মতে যাকোব, আর লুকের মতে এলি)।
ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দিনক্ষণ
যীশুকে ঠিক কোন দিন ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, তা নিয়ে বাইবেলের সুসমাচারগুলোর মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।
অসঙ্গতি: মথি, মার্ক এবং লুকের মতে, যীশু বৃহস্পতিবার রাতে শিষ্যদের নিয়ে ইহুদীদের 'পাসওভার' বা নিস্তারপর্বের খাবার খেয়েছিলেন (যাকে Last Supper বলা হয়) এবং পরদিন শুক্রবার সকালে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়।
কিন্তু যোহনের সুসমাচার বলছে ভিন্ন কথা! যোহনের মতে, যীশু পাসওভারের খাবার খাওয়ার সুযোগই পাননি। তাঁর মতে, যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল পাসওভার শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন দুপুরে—ঠিক সেই মুহূর্তে যখন মন্দিরে পাসওভারের ভেড়া (Lamb) বলি দেওয়া হচ্ছিল। গবেষকরা বলেন, যীশুকে 'ঈশ্বরের মেষশাবক' (Lamb of God) হিসেবে উপস্থাপন করার জন্যই যোহন ইচ্ছাকৃতভাবে দিনক্ষণ পরিবর্তন করেছিলেন।
যিহূদার মৃত্যু (Death of Judas Iscariot)
যে শিষ্য যীশুকে রোমানদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই যিহূদা ঈষ্করিয়োতের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল?
অসঙ্গতি: মথি (২৭:৫) বলছে, যিহূদা অনুতপ্ত হয়ে রুপোর কয়েনগুলো মন্দিরে ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং গিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
অন্যদিকে, বাইবেলের 'প্রেরিতদের কার্যবিবরণী' বা Acts (১:১৮) বলছে, যিহূদা সেই টাকা দিয়ে একটি জমি কেনেন এবং সেখানে মাথা নিচের দিকে করে পড়ে যান এবং তাঁর পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যায়। এই রকম ঐতিহাসিক গরমিল বাইবেলের দিকে আঙ্গুল তুলে আমাদের আরেকবার ভাবার জন্য বাধ্য করে। আদৌ কি যীশু বলে কেউ ছিলেন ? তাঁর কাহিনী কি আদৌ সত্য নাকি অতিরঞ্জিত ?
উপসংহার
লুক ২২:৪৩-৪৪ আয়াত দুটি সম্ভবত যীশুর মূল সুসমাচারের অংশ ছিল না। এটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীর ধর্মীয় বিতর্কের প্রেক্ষাপটে যীশুর মানবিক কষ্ট এবং বাস্তব অস্তিত্বকে প্রমাণ করার জন্য পরবর্তীকালে যুক্ত করা হয়েছিল। এটি বাইবেল কীভাবে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত এবং অপ্টিমাইজ হয়েছে, তার একটি চমৎকার ঐতিহাসিক দলিল। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্মে 'ডওসিটিজম' নামক একটি মতবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। এই মতবাদের অনুসারীরা বিশ্বাস করত যে, যীশু পুরোপুরি ঈশ্বর ছিলেন এবং তাঁর মানবদেহটি ছিল কেবল একটি 'ভ্রম' বা 'আত্মিক রূপ'। তাঁদের মতে, ঈশ্বর যেহেতু কষ্ট পেতে পারেন না, তাই যীশু ক্রুশে বা গেৎশিমানি বাগানে বাস্তবে কোনো শারীরিক বা মানসিক কষ্ট পাননি।
এই মতবাদকে ভুল প্রমাণ করার জন্য এবং যীশু যে "রক্তমাংসের আসল মানুষ" ছিলেন এবং মানুষের মতোই চরম কষ্ট ভোগ করেছিলেন, তা জোর দিয়ে দেখানোর জন্য কোনো লেখক সম্ভবত এই অংশটি লুকের সুসমাচারে যুক্ত করেছিলেন। যীশুর চরম মানসিক যন্ত্রণা, স্বর্গীয় দূতের সান্ত্বনা এবং "ঘাম রক্তের বিন্দুর মতো" ঝরে পড়া—এই সব কিছুই তাঁর তীব্র মানবিক অস্তিত্বকে প্রমাণ করে।
সবই বিশ্বাস ও আস্থার ব্যাপার। আমরা পাশ্চাত্য দেশের ধর্মের ইতিহাস জেনে রাখার জন্যই এগুলো পড়বো। তাঁদের আস্থা বা বিশ্বাসকে আঘাত করার জন্য নয়। আমাদের উচিত যাতে ভুল করেও "নামপরাধ পাপ" না হয় , সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আপনার কি মত ?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন