সম্প্রতি ভারতের উত্তরাখণ্ডের ঋষিকেশ থেকে সানিউর রহমান নামক এক বাংলাদেশির গ্রেপ্তারের ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যিনি ইন্টারনেটে 'সত্যনিষ্ঠ আর্য' নামে পরিচিত এবং নিজেকে একজন হিন্দু ধর্মগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তার আসল পরিচয় সামনে আসার পর শুরু হয়েছে গুজবের বন্যা। রাতারাতি তাকে 'ইসলামি গুপ্তচর' বা 'আইএসআই এজেন্ট' তকমা দিয়ে অসংখ্য ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এই সস্তা প্রোপাগান্ডার আড়ালে লুকিয়ে আছে চরমপন্থার শিকার হওয়া একজন মানুষের একাকীত্ব, ট্রমা এবং আদর্শিক বিচ্যুতির এক মর্মান্তিক করুণ কাহিনি।
২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চ এবং নাস্তিকতার অধ্যায়
সানিউরের অতীত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কখনোই কোনো ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এর ঘোর বিরোধী। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা 'গণজাগরণ মঞ্চ'-এর একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি পরিপূর্ণ একজন নাস্তিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও ব্লগে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করতেন।
নিজের এই নির্ভীক অবস্থানের জন্য তাকে চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। ২০১৩ সালেই ইসলামি উগ্রবাদীরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চাপাতি দিয়ে মারাত্মকভাবে কুপিয়ে জখম করে। মুমূর্ষু অবস্থা থেকে তিনি সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে ফিরলেও, হারান জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। মৌলবাদের কারণে নিজের দেশ, পরিবার এবং ক্যারিয়ার—সবকিছু হারিয়ে ২০১৬ সালের দিকে তিনি ভারতে প্রবেশ করতে বাধ্য হন।
আদর্শিক পরিবর্তন এবং সেক্যুলারিজমের প্রতি ক্ষোভ
ভারতে এসে তার আদর্শিক অবস্থানে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। যে মানুষটি একসময় পরিপূর্ণ নাস্তিক ছিলেন, তিনি আর্য সমাজ মন্দিরে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন এবং 'সত্যনিষ্ঠ আর্য' নাম ধারণ করেন। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।
ভারতে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের কিছু বামপন্থী এবং সেক্যুলার হিন্দুদের মধ্যে ইসলাম তোষণ বা মৌলবাদের বিপদকে এড়িয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা তিনি লক্ষ্য করেন, তা তাকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। নিজ দেশে উগ্রবাদের বীভৎস রূপ এবং ধারালো অস্ত্রের কোপ তিনি নিজের শরীর দিয়ে অনুভব করেছিলেন। তাই যখন তিনি দেখেন সেক্যুলার সমাজ এই বিপদের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তিনি সেক্যুলার হিন্দুদের সমালোচনা করে ভিডিও বানাতে শুরু করেন। ইসলাম তোষণের ফলে হিন্দুদের কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, সেটি তুলে ধরাই ছিল তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য।
দীর্ঘদিনের একাকীত্ব এবং মানসিক ট্রমার পরিণতি
যে সমাজ থেকে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন, নতুন দেশেও তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ বা স্থিতিশীল হতে পারেননি। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং সারাক্ষণ তাড়া খেয়ে বেড়ানোর মানসিক চাপ যেকোনো মানুষকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
সানিউরের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। পিটিএসডি (PTSD) বা চরম মানসিক ট্রমা এবং একাকীত্ব তাকে ধীরে ধীরে এক ধরনের রিভার্স উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেয়। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে বা সমমনা মানুষের একটু স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় তিনি এমন সব উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিতে শুরু করেন, যা তার প্রাথমিক যুক্তিবাদী সত্তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইনের চোখে তিনি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হতে পারেন, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তার যে উন্নত মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন, এই সত্যটি সমাজ খুব সহজেই এড়িয়ে যায়।
'ইসলামি গুপ্তচর' তত্ত্বের চরম অসারতা
গ্রেপ্তারের পর সোশ্যাল মিডিয়ার একাংশ তাকে যেভাবে 'ইসলামি গুপ্তচর' সাজানোর চেষ্টা করছে, তা বাস্তবতার নিরিখে একেবারেই ভিত্তিহীন। যে ব্যক্তি ইসলামি মৌলবাদীদের হাতে ধারালো অস্ত্রের কোপ খেয়েছেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং ইসলামি উগ্রবাদের কট্টর সমালোচক, তাকে 'গুপ্তচর' বলাটা ইতিহাস সম্পর্কে চরম অজ্ঞতার প্রমাণ।
মূলত যারা এতদিন তাকে অন্ধভাবে ধর্মগুরু মেনেছিলেন, তার আসল পরিচয় প্রকাশের পর নিজেদের দায় এড়াতে এবং ড্যামেজ কন্ট্রোল করতেই তারা এই সস্তা গুজবের আশ্রয় নিচ্ছেন।
আইনি পদক্ষেপ: অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাল নথিপত্র তৈরি এবং ফরেনার্স অ্যাক্ট (Immigration and Foreigners Act)-এর অধীনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ বর্তমানে ডানপন্থী সংগঠনগুলোর সাথে তার সংযোগ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে তদন্ত করছে।
উপসংহার
সানিউর রহমানের ঘটনাটি সাদা-কালো দিয়ে বিচার করার মতো কোনো সাধারণ অপরাধের খবর নয়। এটি ধর্মীয় উগ্রবাদের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানো একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পতন এবং টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টার গল্প। ভারতের আইন তার অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জালিয়াতির বিচার করবে—এটাই স্বাভাবিক।
ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আইনিভাবে হয়তো কাউকে আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু যখন কেউ সমাজের ভেতরেই বিভেদ এবং বিদ্বেষের বীজ বপন করে, তখন তার নিজস্ব নিরাপত্তা বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সে নিজেই নষ্ট করে ফেলে। সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি হলো প্রেম, ভক্তি এবং সহনশীলতা। তিনি সেই জায়গায় আঘাত করেছিলেন। প্রেমানন্দ মহারাজের মতো সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং ভক্তিমার্গীয় সাধুকে কটূক্তি করাটা যে তার জন্য কতটা বুমেরাং হয়েছে, আজকের এই চরম একাকীত্বই তার প্রমাণ। উগ্রতা দিয়ে হয়তো সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করা যায়, কিন্তু স্থায়ী শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না।
মানুষ যখন উগ্রতার চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন সে আসলে নিজের সব শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রক্ষাকবচকে দূরে ঠেলে দেয়।
তবে এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে যায় যে, সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার গুজবে কান দেওয়ার আগে ঘটনার গভীরে প্রবেশ করা কতটা জরুরি। উগ্রবাদ কেবল মানুষের শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করে না, উপযুক্ত মানসিক সহায়তার অভাবে এটি একজন মানুষের সুস্থ চিন্তাধারাকেও চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন