অর্থাৎ— বেদ শাস্ত্র পূরণ ইত্যাদি শাস্ত্র গুলো গণিকা অর্থাৎ বেশ্যার মতো, কিন্তু শিবক্ত শাম্ভবী বিদ্যা কুল বধূর মতো। অতএব — গোপন রাখতে হয়।
দার্শনিক অর্থ: গণিকা যেমন সমাজের সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, ঠিক তেমনি বেদ, পুরাণ এবং উপনিষদের জ্ঞান সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ বাজার থেকে বই কিনে তা পড়তে পারে, তার আক্ষরিক অর্থ বুঝতে পারে এবং সাধারণ আচার-অনুষ্ঠান করতে পারে। এই জ্ঞানগুলো বাইরের জগতের (Exoteric), তাই এগুলোকে গোপন করার কিছু নেই।
শাম্ভবী বিদ্যা বা তন্ত্র (কুলবধূর রূপক)
অন্যদিকে, 'শাম্ভবী বিদ্যা' অর্থাৎ শিবোক্ত তন্ত্রবিদ্যা বা কুণ্ডলিনী যোগ হলো 'কুলবধূ' বা সম্ভ্রান্ত ঘরের পুত্রবধূর মতো।
দার্শনিক অর্থ: একজন কুলবধূ যেমন নিজেকে বাইরের মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে রাখেন এবং কেবল নিজের পরিবারের বা 'কুলের' অন্দরমহলেই তাঁর প্রকৃত রূপ ও মর্যাদা প্রকাশ পায়, তন্ত্রবিদ্যাও ঠিক তাই। এই জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কৌতূহল মেটানোর জন্য বাজারে প্রদর্শন করা যায় না। এটি কেবল সেই 'কুলের' (গুরু-শিষ্য পরম্পরার) অন্দরমহলেই দীক্ষাপ্রাপ্ত যোগ্য শিষ্যের কাছে উন্মোচিত হয়।
গোপনীয়তার প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক কারণ
কিছু অসাধু লোক ও বিধর্মীরা তন্ত্র নিয়ে অপপ্রচার চালায়। ঋষিরা ঠিক এই বিপদের কথাই জানতেন। তন্ত্র হলো এক প্রচণ্ড শক্তিশালী 'এনার্জি সায়েন্স' (Energy Science)। একটি পারমাণবিক চুল্লির নকশা যেমন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যায় না, তেমনি কুণ্ডলিনী জাগরণ, চক্রভেদ বা পঞ্চ মকারের মতো মহাশক্তিশালী সাধনার চাবিকাঠি সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।
সাধারণ 'পশুভাবাপন্ন' মানুষের মন কাম, লোভ এবং ভোগে আসক্ত থাকে। এই গুপ্ত জ্ঞান তাদের হাতে পড়লে তারা মোক্ষ লাভের বদলে একে জাগতিক স্বার্থ বা অন্যের ক্ষতির কাজে (যেমন- মারণ, উচাটন) ব্যবহার হচ্ছে। এই অপব্যবহার রোধ করার জন্যই তন্ত্রকে কুলবধূর মতো 'গোপ্যা' বা গোপন রাখা হয়েছে এবং সাধারণের নাগালের বাইরে রাখতে সন্ধ্যা ভাষার কঠিন মোড়কে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রে সন্ধ্যা ভাষা বা সাঙ্কেতিক ভাষার ব্যবহার একটি সুচিন্তিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। তন্ত্রের ভাষায়, বাইরের জগতের সমস্ত কিছু (নদী, পর্বত, দেব-দেবী, আচার) আসলে মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক জগতের (Microcosm) রূপক।
কোথায় সরাসরি বলা হয়েছে যে তন্ত্রের ভাষা সাংকেতিক?
তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে একাধিক স্থানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, বাইরের আক্ষরিক অর্থটি আসল নয়; এর প্রকৃত অর্থ সাধকের দেহের ভেতরে নিহিত।
ক. শিব সংহিতা (Shiva Samhita) - ভৌগোলিক রূপক:
তন্ত্র ও হঠযোগের অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ 'শিব সংহিতা'-র দ্বিতীয় পটলের (অধ্যায়) একেবারে শুরুতেই বলা হয়েছে যে, বাইরের জগতের সমস্ত কিছুর বর্ণনা আসলে মানুষের দেহের ভেতরের সূক্ষ্ম নাড়ী ও চক্রের সাঙ্কেতিক রূপ।
মূল শ্লোক (২/১-২):
অর্থ: এই মানবদেহের ভেতরেই মেরু পর্বত (মেরুদণ্ড) এবং সপ্তদ্বীপ (সাতটি চক্র) অবস্থিত। সমস্ত নদী, সাগর, পর্বত, তীর্থক্ষেত্র, তীর্থরক্ষক, ঋষি, মুনি, নক্ষত্র এবং গ্রহ— সবকিছুই এই দেহের ভেতরেই বিদ্যমান।
শিব ও ভৈরব: তন্ত্রে শিব বা ভৈরব কোনো কৈলাসবাসী দেবতা নন। শিব হলেন 'বিশুদ্ধ চৈতন্য' (Pure Consciousness)-এর সাঙ্কেতিক নাম, যা সহস্রার চক্রে স্থির হয়ে থাকে।
শক্তি (কালী, দুর্গা, ডাকিনী ইত্যাদি): শক্তি হলো 'কাইনেটিক এনার্জি' বা ক্রিয়াশীল শক্তি। মূলাধারে তিনি কুণ্ডলিনী, আর চক্রগুলোতে তিনি ডাকিনী, রাকিণী, লাকিণী ইত্যাদি নামে পূজিতা হন। এগুলো হলো মানুষের স্নায়ুকেন্দ্রের ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি বা স্পন্দন।
দানব বা অসুর বধা: চণ্ডী বা তন্ত্রে দেবী কর্তৃক মহিষাসুর, শুম্ভ-নিশুম্ভ বা রক্তবীজ বধ করার যে বর্ণনা আছে, তা বাইরের কোনো যুদ্ধ নয়। যোগীর সাধনার পথে মহিষাসুর হলো 'অহংকার ও মূঢ়তা', আর রক্তবীজ হলো 'বাসনা' (যা কাটলে আরও বহুগুণ বেড়ে যায়)। দেবীর খড়্গ হলো 'আত্মজ্ঞান', যা দিয়ে সাধক ভেতরের এই অসুরদের বধ করেন।
সর্প বা সাপ: মূলাধার চক্রে সুপ্ত কুণ্ডলিনী শক্তিকে 'সর্পিণী' বা 'নাগিনী' বলা হয়। সাপ যেমন কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমায়, মানুষের বিপুল জীবনীশক্তিও তেমনি মেরুদণ্ডের নিচে সুপ্ত থাকে।
হংস (Swan): তন্ত্রে হংস কোনো পাখি নয়। এটি হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের ধ্বনি। মানুষ যখন শ্বাস নেয় তখন 'হং' এবং যখন ছাড়ে তখন 'সঃ' ধ্বনি হয়। অর্থাৎ, প্রতিটি শ্বাস বলছে "হংসঃ" বা "অহং সঃ" (আমিই সে / I am That)। এটিই হলো অজপা জপ।
পদ্ম বা কমল (Lotus): শারীরিক চক্রগুলোকে তন্ত্রে 'পদ্ম' বলা হয়। পদ্ম যেমন পাঁক থেকে উঠেও পাঁকে লিপ্ত হয় না, তেমনি মানুষের স্নায়ুকেন্দ্রগুলো (চক্র) স্থূল শরীরের অংশ হয়েও চেতনার সূক্ষ্ম স্তরে বিকশিত হয়।
শ্মশান সাধনা: এর আক্ষরিক অর্থ হলো মৃতদেহ পোড়ানোর জায়গায় বসে সাধনা।
সাঙ্কেতিক বা যোগিক অর্থ: 'শ্ম' মানে শব (মৃতদেহ) আর 'শান' মানে শয়ন। তন্ত্রে মানুষের 'হৃদয়'-কেই সবচেয়ে বড় শ্মশান বলা হয়েছে। যখন সাধক তাঁর হৃদয়ে সমস্ত জাগতিক কামনা, বাসনা, মোহ এবং অহংকারকে চিতার আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেন, তখন সেই বাসনাশূন্য হৃদয়ই হয়ে ওঠে শ্মশান। আর কেবল সেই পবিত্র ও শূন্য হৃদয়েই (শ্মশানে) মহাশক্তি কালীর আবির্ভাব ঘটে।
তন্ত্রের এই সন্ধ্যা ভাষা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন আদিম বিদ্যা নয়, বরং এটি মানবদেহ এবং মনের এক অত্যন্ত উচ্চমার্গের 'এনার্জি সায়েন্স'। বাইরের খোলসটি রূপকের, কিন্তু ভেতরের নির্যাসটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের।
|
অবতারের নাম |
সংশ্লিষ্ট নাড়ী/চক্র/গ্রন্থি |
তান্ত্রিক ও যোগিক নিগূঢ় অর্থ (Esoteric Meaning) |
|---|---|---|
|
মৎস্য (Fish) |
ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ী |
চঞ্চল প্রাণবায়ুর প্রতীক। মাছ যেমন জলে ভাসে, প্রাণও নাড়ীতে ভাসে। প্রাণায়ামের মাধ্যমে এই চঞ্চল শ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রাথমিক পর্যায়। |
|
কূর্ম (Tortoise) |
অনাহত চক্র / কূর্ম নাড়ী |
'প্রত্যাহার' বা ইন্দ্রিয় সংবরণের প্রতীক। কচ্ছপ যেমন তার অঙ্গ গুটিয়ে নেয়, সাধকও তেমন বহির্জগৎ থেকে মনকে গুটিয়ে অন্তরে স্থির করেন। |
|
বরাহ (Boar) |
মূলাধার চক্র (ক্ষিতি তত্ত্ব) |
'অপান বায়ু'-র ঊর্ধ্বগতির প্রতীক। কাদা থেকে পৃথিবীকে তোলার অর্থ হলো— চেতনাকে স্থূল জড়তা ও কামনাবাসনা থেকে মুক্ত করে ঊর্ধ্বে নিয়ে আসা। |
|
নৃসিংহ (Man-Lion) |
সুষুম্না নাড়ী / ব্রহ্ম গ্রন্থি |
'সন্ধ্যা' বা দুই অবস্থার মিলনস্থল। যখন শ্বাস ইড়া বা পিঙ্গলায় না বয়ে সুষুম্নায় প্রবেশ করে, তখন যে প্রচণ্ড তেজ বা ওজঃ সৃষ্টি হয়, যা 'অহংকার' বিনাশ করে। |
|
বামন (Dwarf) |
আজ্ঞাচক্র (আকাশ তত্ত্ব) |
'শূন্যতা' ও 'বিরাটত্ব'-র প্রতীক। ক্ষুদ্র অহং যখন ব্রহ্মাণ্ডের অসীম আকাশে (Space) ছড়িয়ে পড়ে, তখন সে ক্ষুদ্র হয়েও তিন পদে (স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ শরীর) আধিপত্য বিস্তার করে। |
|
পরশুরাম (Warrior) |
বিশুদ্ধ চক্র / রুদ্র গ্রন্থি |
'ত্যাগ ও কর্তন'-এর প্রতীক। কুঠার হলো সেই তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধি যা শরীরের ১০টি বায়ু ও ২১টি কুল বা সংস্কারকে (অহংকারের স্তর) ছেদন করে পরম শিবত্ব লাভের পথ পরিষ্কার করে। |
|
শ্রীরাম (Ideal Man) |
অনাহত ও আজ্ঞা চক্রের সংযোগ |
'ধর্ম ও সংযম'-এর প্রতীক। প্রাণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং কাম (রাবণ) ও লঙ্কার (অহংকার) মায়া কাটিয়ে সীতাকে (আত্মবিদ্যা বা কুণ্ডলিনী) উদ্ধারের রূপক। |
|
শ্রীকৃষ্ণ (Divine Soul) |
সহস্রার চক্র |
পূর্ণাবতার' বা অদ্বৈত চেতনার প্রতীক। আনন্দ ও লীলার মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার চূড়ান্ত মিলন। এখানে রাধা হলেন কুণ্ডলিনী শক্তি এবং কৃষ্ণ হলেন পরম শিব। |
যদি এগুলো কেবলই চিহ্ন বা রূপক হয় তাহলে পূজা কেন করা হয়?
উপসংহার
পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, সনাতন ধর্মের পৌরাণিক কাহিনী বা অবতারতত্ত্ব কোনো 'আষাঢ়ে গল্প' বা 'সার্কাস' নয়। এগুলো হলো উচ্চতর আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে মনে রাখার জন্য প্রাচীন ঋষিদের তৈরি এক একটি 'মেমোরি প্যালেস' (Memory Palace)। যারা একে কেবল মাছ, শূকর বা অদ্ভুত লড়াইয়ের গল্প হিসেবে দেখেন, তারা আসলে সেই আদিম শিশুদের মতো, যারা আইফোনের ভেতরে থাকা জটিল চিপসেট ও কোডিং না বুঝে কেবল তার ওপরের রঙিন কাঁচটি নিয়েই পড়ে থাকে।
আমাদের ঋষিরা জানতেন যে, বিমূর্ত দর্শন (Abstract Philosophy) সাধারণ মানুষের মনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তাই তারা 'বিবর্তন' বা 'প্রাণশক্তি নিয়ন্ত্রণ'-এর মতো জটিল বিষয়গুলোকে গল্পের মোড়কে 'এনক্রিপ্ট' করে দিয়েছিলেন। এটি কোনো অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং এটি ছিল একটি উন্নত সভ্যতার 'ডেটা প্রিজারভেশন' পদ্ধতি।
যাঁরা আজ বিজ্ঞানমনস্কতার দোহাই দিয়ে এগুলোর উপহাস করছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের নিবেদন— বিজ্ঞান কেবল বাইরের জগতকে মাপে, কিন্তু যোগ ও তন্ত্রশাস্ত্র মাপে মানুষের ভেতরের জগতকে। মহাবিশ্বের প্রসারণ যেমন সত্য, মানুষের ভেতরের চেতনার উত্তরণও তেমনই একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
আসুন, আমরা কেবল শ্লোক আওড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সেই শ্লোকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা 'তন্ত্র' (Technology) এবং 'মন্ত্র' (Algorithm)-কে উপলব্ধি করি। হিন্দু ধর্মের প্রকৃত শক্তি তার গল্পে নয়, সেই গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চিরন্তন সত্যে।
সত্যমেব জয়তে!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন