সুপ্রিম কোর্টে নতুন বিতর্ক: ব্রাহ্মণরা কি ‘রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর’ হতে পারেন?


ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সংরক্ষণ নীতি সবসময়ই সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি মূল স্তম্ভ। কিন্তু এবার সেই নীতির সীমানা আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে একটি অভিনব প্রশ্ন উঠেছে: যে সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা, জ্ঞান ও সামাজিক মর্যাদায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল—ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উচ্চবর্ণ—তারা কি গ্রাম পঞ্চায়েত বা পুরসভার মতো স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাবে ‘রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণি’ (Politically Backward Class বা PBC) হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসন সংরক্ষণ পেতে পারে?

পটভূমি: সংরক্ষণের ঐতিহ্য ও সীমা

ভারতের সংবিধানের ৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনী (১৯৯২) পঞ্চায়েত ও পুরসভায় SC, ST এবং মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। OBC-দের জন্যও রাজ্য সরকারগুলি সংরক্ষণ দিতে পারে, কিন্তু সেই সংরক্ষণের জন্য কঠোর শর্ত রয়েছে। ২০১০ সালের K. Krishna Murthy vs Union of India মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ (Constitution Bench) স্পষ্ট করে দিয়েছে যে:

  • সামাজিক-অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা (social & economic backwardness) মানেই রাজনৈতিক অনগ্রসরতা (political backwardness) নয়।
  • OBC-দের জন্য স্থানীয় সংস্থায় সংরক্ষণ দিতে হলে **‘Triple Test’** পূরণ করতে হবে:
    •   1. একটি নিবেদিত কমিশন দিয়ে রাজনৈতিক অনগ্রসরতার উপর কঠোর তথ্য-ভিত্তিক অনুসন্ধান।
    •   2. প্রত্যেক স্থানীয় সংস্থায় আলাদাভাবে অ-প্রতিনিধিত্বের হিসাব করে সংরক্ষণের অনুপাত নির্ধারণ।
    •   3. SC/ST/OBC মিলিয়ে মোট সংরক্ষণ ৫০% ছাড়িয়ে যাবে না।


এই রায়ের পর মহারাষ্ট্রে Banthia Commission (জয়ন্তকুমার বান্থিয়া কমিটি) গঠিত হয়েছিল OBC সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু সেই কমিশনের সুপারিশকেই চ্যালেঞ্জ করে Youth for Equality Foundation নামক একটি এনজিও (সিনিয়র অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করনারায়ণনের নেতৃত্বে) সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছে (W.P.(C) No. 000078/2026)।

নতুন দাবি: ব্রাহ্মণদের রাজনৈতিক অনগ্রসরতা

মামলাকারীরা মহারাষ্ট্রের পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনের তথ্য দেখিয়ে দাবি করেছেন যে ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তারা যুক্তি দিয়েছেন:

  • অতীতে সামাজিক-শিক্ষাগত অগ্রগতি থাকলেও, আজকের গ্রামীণ ও শহুরে স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য।
  • K. Krishna Murthy রায় অনুসারে রাজনৈতিক অনগ্রসরতা আলাদা বিষয়—তাই শুধু অ-প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নতুন শ্রেণি তৈরি করা যায়।
  • Banthia কমিশন OBC তালিকা মেকানিক্যালি গ্রহণ করেছে, Triple Test পুরোপুরি মানেনি।

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই মামলা শুনানি করে বলেছেন যে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে রাজি। তবে প্রাথমিকভাবে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছেন যে রাজনৈতিক অনগ্রসরতা সাধারণত সামাজিক-শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণির (SEBC) মধ্য থেকেই উঠে আসে। শুধু অ-প্রতিনিধিত্ব যথেষ্ট নাও হতে পারে নতুন ক্যাটাগরি তৈরির জন্য।

এই মামলাটি মহারাষ্ট্রের অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচন-সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আদালত সব পক্ষকে নোটিস পাঠিয়েছে।

সম্ভাব্য প্রভাব

যদি সুপ্রিম কোর্ট এই দাবি মেনে নেয়, তাহলে:

  •  সংরক্ষণ নীতির ধারণা আমূল বদলে যাবে—এটি শুধু ঐতিহাসিক অবিচারের প্রতিকার নয়, বর্তমান রাজনৈতিক অসমতুল্যতারও সমাধান হয়ে উঠবে।
  • অনেক রাজ্যে নতুন কমিশন গঠনের দাবি উঠতে পারে।
  • তবে ৫০% সিলিং অটুট থাকলে নতুন সংরক্ষণ মানে অন্যান্য শ্রেণির জন্য কম আসন।

অন্যদিকে, যদি আদালত প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে এটি স্পষ্ট করে দেবে যে রাজনৈতিক অনগ্রসরতার স্বীকৃতি সামাজিক-শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়া ছাড়া সম্ভব নয়।

শেষ কথা

এই মামলা শুধু ব্রাহ্মণদের প্রতিনিধিত্বের লড়াই নয়—এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল প্রশ্ন তুলে ধরছে: সংরক্ষণ কি শুধু অতীতের অবিচার মেটানোর হাতিয়ার, নাকি বর্তমানের যেকোনো ধরনের অ-প্রতিনিধিত্বেরও প্রতিকার? ফলাফল যাই হোক, এটি স্থানীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে।

তথ্যসূত্র:

  1. সুপ্রিম কোর্টের শুনানি রিপোর্ট, 
  2. Times of India, 
  3. Moneycontrol,
  4.  LiveLaw, 
  5. Supreme Court Observer প্রভৃতি, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি আপডেট অনুসারে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Advertisement