পাপের প্রায়শ্চিত্ত ও চিত্তশুদ্ধি: মনুস্মৃতির শোধন বিধি।


 দেশং কালং চ শক্তিং চ বিদ্যাং চৈব যথাতথঃ ।যথাধর্মং প্রকলপ্যতে প্রায়শ্চিত্তানি তদ্বিদা।। (মনুস্মৃতি ১১/২০৯)

​অর্থাৎ— দেশ, কাল, ব্যক্তির শারীরিক শক্তি এবং তার জ্ঞান বিচার করে বিদ্বানগণ উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত স্থির করবেন। কোনো দুর্বল ব্যক্তির ওপর এমন ব্রত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় যা তার প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

মনুষ্য জীবনে জ্ঞানে বা অজ্ঞানে নানাবিধ ত্রুটি বা পাপ সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই পাপে নিমজ্জিত না থেকে নিজেকে পুনরায় শুদ্ধ করে তোলাই হলো আর্য্য জীবনের ধর্ম। মনুস্মৃতির একাদশ অধ্যায়ে পাপ থেকে মুক্তি এবং চিত্তশুদ্ধির অমোঘ উপায়সমূহ বর্ণিত হয়েছে। পাঠকদের জন্য আত্মশুদ্ধির সেই পথগুলি নিচে তুলে ধরা হলো।

১. পাপ স্বীকার ও অনুতাপের মহিমা

পাপমুক্তির প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো নিজের অপরাধ স্বীকার করা এবং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনুতপ্ত হওয়া। গোপন পাপ মানুষের আত্মাকে দহন করে, কিন্তু তা স্বীকার করলে ভারমুক্ত হয়।

খ্যাপনেনানুতাপেন তপসাধ্যয়নেন চ। 
পাপকৃন্মচ্যতে পাপাৎ তথা দানেন চাপদি।। (মনুস্মৃতি ১১/২২৭)

অর্থাৎ, পাপ স্বীকার (খ্যাপন), অনুতাপ, তপস্যা, বেদাধ্যয়ন এবং বিশেষ বিপদে দান করার মাধ্যমে পাপী ব্যক্তি পাপ থেকে মুক্তি লাভ করে। মনের অনুতাপই হলো শ্রেষ্ঠ অগ্নি যা পাপকে ভস্মীভূত করে।

পুনরায় পাপ না করার সংকল্প

কেবল প্রায়শ্চিত্ত করলেই হবে না, ভবিষ্যতে সেই কর্ম আর না করার দৃঢ় সংকল্পই প্রকৃত শুদ্ধি।

যথা যথা নরঃ অধর্মং স্বয়ং কৃত্বা পভাষতে।
তথা তথা ত্বচৈবাহিস্তেনাধর্মেণ মুচ্যতে।। (মনুস্মৃতি ১১/২২৮)
 যথা যথা মনস্তস্য দুষ্কৃতং কর্ম গর্হতি। 
তথা তথা শরীরং তৎ তেনাধর্মেণ মুচ্যতে।। (মনুস্মৃতি ১১/২২৯)

মানুষ যেমন নিজের কৃত পাপ অন্যের কাছে (উপযুক্ত গুরু বা সজ্জন) প্রকাশ করে এবং তার মন সেই মন্দ কর্মের জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয়, ঠিক তেমনি সাপ যেমন তার খোলস ত্যাগ করে, মানুষও তেমনি সেই পাপ থেকে বিমুক্ত হয়।

চিত্তশুদ্ধির প্রধান উপায়সমূহ

মনুস্মৃতিতে প্রধানত চারটি উপায়ে চিত্তশুদ্ধির কথা বলা হয়েছে:

  •   তপস্যা (Tapas): ইন্দ্রিয় নিগ্রহ এবং সংযম পালন। কচ্ছ্র চান্দ্রায়ণ ব্রত বা উপবাসের মাধ্যমে শরীর ও মনকে দগ্ধ করে শুদ্ধ করা।
  •  জ্ঞান ও অধ্যায়ন (Vidya): নিয়মিত শাস্ত্র ও বেদ পাঠ করলে মনের অজ্ঞানতা দূর হয়। জ্ঞানাগ্নি সকল অশুভ সংস্কার পুড়িয়ে দেয়।
  •  দান (Charity): বিশেষ করে অভাবী ও যোগ্য ব্যক্তিকে অন্ন, বস্ত্র বা ভূমি দান করলে সঞ্চিত পাপের ভার লাঘব হয়।
  •  প্রাণায়াম ও ধ্যান: শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ এবং পরমাত্মার ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া মনের ময়লা দূর করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।

পাপের প্রকারভেদে প্রায়শ্চিত্ত

পাপের গুরুত্ব অনুসারে মনু মহারাজ বিভিন্ন বিধান দিয়েছেন। ছোটখাটো ভুলের জন্য একদিন উপবাস বা গায়ত্রী মন্ত্র জপই যথেষ্ট। কিন্তু গুরুতর অপরাধের (মদুপান, ব্রহ্মহত্যা ইত্যাদি) জন্য কঠোর 'প্রাজাপত্য' বা 'চান্দ্রায়ণ' ব্রতের বিধান দেওয়া হয়েছে।

প্রাস্যান্ত্সু তোয়ং প্রাণায়ামৈঃ শোধয়েদাত্মনঃ। সাবিত্রীং বা জপেদ্বিদ্বান্ দানং বা দদ্যাচ্ছক্তিতঃ।। (মনুস্মৃতি ১১/২৬৪)

অর্থাৎ, পাপমুক্তির জন্য জলে স্নান করে প্রাণায়াম করা, সাবিত্রী (গায়ত্রী) মন্ত্র জপ করা এবং সাধ্যমতো দান করা অত্যন্ত ফলদায়ক।

কেন এই প্রায়শ্চিত্ত প্রয়োজন?

পাপ কেবল পরলোকের বিষয় নয়, ইহলোকেও এটি মানুষের মেধা, যশ এবং শান্তি নষ্ট করে। প্রায়শ্চিত্ত করলে:

  1.  * আত্মবল বৃদ্ধি পায়: মানুষ হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি পায়।
  2.  * সামাজিক মর্যাদা: প্রায়শ্চিত্তের পর সমাজে সেই ব্যক্তি পুনরায় সম্মানের যোগ্য হয়।
  3.  * কর্মফল খণ্ডন: অনুতাপ ও তপস্যার মাধ্যমে কর্মের কুফল প্রশমিত হয়।

 অভক্ষ ভক্ষণের প্রায়শ্চিত্ত

যদি কেউ ভুল বশত গো-মাংস, কুকুর বা মানুষের মাংস ভক্ষণ করে। তবে একে 'অমেধ্য' বা পরম অপবিত্র কর্ম বলা হয়। যদি কেউ ভুলবশত এগুলো ভক্ষণ করে ফেলে, তবে তার জন্য মনুস্মৃতিতে 'তপ্ত-কচ্ছ্র' বা 'চান্দ্রায়ণ' ব্রতের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

  • গো-মাংস ভক্ষণ: গাভী হিন্দু ধর্মে পরম পবিত্র ও পূজনীয়। ভুলবশত গো-মাংস ভক্ষণ করলে সাধককে এক মাস ব্যাপী চান্দ্রায়ণ ব্রত পালন করতে হয় এবং একটি গো-মিথুন (গাভী ও ষাঁড়) দান করতে হয়।
  • কুকুর ও গ্রাম্য শুকর: কুকুরের মাংস ভক্ষণ করলে চিত্ত অত্যন্ত কলুষিত হয়। এর জন্য বারো দিনের প্রাজাপত্য ব্রত বা গায়ত্রী মন্ত্রের লক্ষ জপ বিহিত।

চান্দ্রায়ণ ব্রত

মনুস্মৃতিতে বর্ণিত সকল প্রায়শ্চিত্তের মধ্যে 'চান্দ্রায়ণ ব্রত' অত্যন্ত দুর্লভ এবং প্রভাবশালী। এই ব্রতের বিশেষত্ব হলো, এর আহারের পরিমাণ চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধির (তিথি) ওপর নির্ভর করে। এটি কেবল শরীরকে শুদ্ধ করে না, বরং মানুষের মনের ওপর চন্দ্রের যে প্রভাব, তাকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

চান্দ্রায়ণ ব্রতের স্বরূপ ও বিধি

​চান্দ্রায়ণ ব্রত সাধারণত এক মাস ব্যাপী পালিত হয়। মনু মহারাজ এর দুটি প্রধান রূপ বর্ণনা করেছেন— যবমধ্য (শুক্লপক্ষ থেকে শুরু) এবং পিপীলিকামধ্য (কৃষ্ণপক্ষ থেকে শুরু)।

একৈকং হ্রাসয়েৎ পিণ্ডং কৃষ্ণে শুক্লে চ বর্ধয়েৎ। উপস্পৃশংস্ত্রিষবণমেতচ্চান্দ্রায়ণং স্মৃতম্।। (মনুস্মৃতি ১১/২১৬)

ব্রতের নিয়মাবলী:

  • শুক্লপক্ষ: প্রতিপদ তিথিতে এক গ্রাস (পিণ্ড) অন্ন দিয়ে শুরু করে প্রতিদিন এক এক গ্রাস বাড়িয়ে পূর্ণিমায় ১৫ গ্রাস অন্ন গ্রহণ করতে হয়।
  • কৃষ্ণপক্ষ: প্রতিপদ তিথিতে ১৪ গ্রাস দিয়ে শুরু করে প্রতিদিন এক এক গ্রাস কমিয়ে অমাবস্যায় পূর্ণ উপবাস পালন করতে হয়।

​অর্থাৎ, চন্দ্রের কলা যেমন বাড়ে ও কমে, আহারের পরিমাণও ঠিক সেভাবে নির্ধারিত হয়। ভোজনের গ্রাস হতে হবে একটি ময়ূরীর ডিমের সমান আয়তনের।

​২. চান্দ্রায়ণ ব্রতের প্রকারভেদ

​পাপের গুরুত্ব এবং সাধকের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মনু মহারাজ এর কয়েকটি প্রকরণ দিয়েছেন:

  1. যতি-চান্দ্রায়ণ: প্রতিদিন কেবল আট গ্রাস অন্ন গ্রহণ করা (দিনের মধ্যভাগে)।
  2. শিশু-চান্দ্রায়ণ: প্রতিদিন সকালে চার গ্রাস এবং সন্ধ্যায় চার গ্রাস অন্ন গ্রহণ করা।
  3. সাধারণ চান্দ্রায়ণ: চন্দ্রের কলার সাথে মিল রেখে গ্রাস হ্রাস-বৃদ্ধি করা।

​৩. ব্রত পালনের কঠোর নিয়ম

​এই ব্রত চলাকালীন কেবল আহার নয়, জীবনযাত্রাতেও পূর্ণ সংযম প্রয়োজন:

  • ত্রিকাল স্নান: প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় স্নান করতে হয় (ত্রিষবণ স্নান)।
  • ব্রহ্মচর্য: কায়মনোবাক্যে পবিত্রতা রক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
  • বিলাসিতা বর্জন: মাটিতে শয়ন করা এবং বিলাসদ্রব্য ত্যাগ করা আবশ্যক।
  • মন্ত্র জপ: সারাদিন ইষ্টমন্ত্র বা গায়ত্রী মন্ত্র জপ করে মনকে ঈশ্বরে নিবিষ্ট রাখতে হয়।

​৪. চান্দ্রায়ণ ব্রতের মহিমা ও ফল

​মনুস্মৃতি অনুসারে, এই ব্রত পালন করলে এমনকি অতি গুরুতর পাপ থেকেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এতেন বিধিনা বিপ্রঃ পাপমপো্য মহৎ ক্বচিৎ। বিরাজঃ শুদ্ধো গচ্ছতি পরমাত্মানমব্যয়ম্।। (মনুস্মৃতি ১১/২২০)

​অর্থাৎ, এই বিধি অনুসারে ব্রত পালন করলে ব্রাহ্মণ (বা যেকোনো দ্বিজ) সকল প্রকার মহাপাপ থেকে মুক্ত হয়ে জ্যোতির্ময় হন এবং পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভের যোগ্য হন। এটি সমস্ত চিত্তমল প্রক্ষালন করে আত্মাকে নিষ্কলঙ্ক করে তোলে।

প্রাজাপত্য ব্রত:

প্রাজাপত্য ব্রতের স্বরূপ

​এই ব্রতটি মোট বারো দিনের একটি পর্যায়ক্রমিক সাধনা। একে 'কচ্ছ্র প্রাজাপত্য'ও বলা হয়। মনু মহারাজ এই ব্রতের নিয়মাবলী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছেন:

ত্র্যহং প্রাতস্ত্যহং সায়ং ত্র্যহমদ্যাদযাচিতম্।

ত্র্যহং পরং চ নাশ্নীয়াৎ প্রাজাপত্যং চরন্ দ্বিজঃ।। (মনুস্মৃতি ১১/২১১)


​এই শ্লোক অনুযায়ী, প্রাজাপত্য ব্রতের বারো দিনকে চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:

  1. প্রথম তিন দিন: কেবল প্রাতঃকালে (সকালে) ভোজন করতে হয়।
  2. দ্বিতীয় তিন দিন: কেবল সায়ংকালে (সন্ধ্যায়) ভোজন করতে হয়।
  3. তৃতীয় তিন দিন: কেবল 'অযাচিত' অন্ন গ্রহণ করতে হয় (অর্থাৎ, যে খাদ্যের জন্য প্রার্থনা করা হয়নি বা যা নিজে থেকে কেউ প্রদান করেছে)।
  4. অন্তিম তিন দিন: পূর্ণ উপবাস পালন করতে হয় (জল ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ নিষিদ্ধ)।

​২. ব্রত পালনের আনুষঙ্গিক নিয়ম

​কেবল আহার নিয়ন্ত্রণই এই ব্রতের মূল কথা নয়, এর সাথে কিছু মানসিক ও শারীরিক সংযমও অপরিহার্য:

  • ইন্দ্রিয় নিগ্রহ: ব্রত চলাকালীন কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ থেকে দূরে থাকতে হয়।
  • শৌচ পালন: দিনে তিনবার স্নান এবং পবিত্র বস্ত্র পরিধান করা আবশ্যক।
  • সত্য ভাষণ: সর্বদা সত্য কথা বলতে হয় এবং অনর্থক বাক্যালাপ বর্জন করতে হয়।
  • অহিংসা: কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া বা মনে হিংসা পোষণ করা নিষিদ্ধ।

​৩. কেন এই ব্রত করা হয়?

​মনুস্মৃতি অনুসারে, প্রাজাপত্য ব্রত সেই সকল পাপের জন্য বিহিত যা সরাসরি 'মহাপাপ' নয়, কিন্তু চরিত্রের অবনতি ঘটায়। যেমন:

  • ​নিষিদ্ধ খাদ্য (যেমন পেঁয়াজ, রসুন বা অবক্ষ্য মাংস) ভক্ষণ করলে।
  • ​অসৎ ব্যক্তির কাছ থেকে দান গ্রহণ করলে।
  • ​মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে বা ক্রোধবশত কোনো অনুচিত কাজ করলে।
  • ​শৌচ ও দৈনন্দিন ধর্মকর্মে অবহেলা করলে।

​৪. আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

​এই ব্রতের বিধানের পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে:

  • দেহের শুদ্ধি: ১২ দিনের এই ক্রমিক উপবাস শরীরের বিষাক্ত উপাদান (Toxins) দূর করে পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয়।
  • ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি: ক্ষুধার ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভের মাধ্যমে মানুষের আত্মিক বল ও সংকল্প শক্তি বৃদ্ধি পায়।
  • পাপের ক্ষয়: শাস্ত্রীয় বিশ্বাস মতে, তপস্যার মাধ্যমে অর্জিত তাপ সঞ্চিত পাপের সংস্কারকে পুড়িয়ে ফেলে।

তপ্ত-কচ্ছ্র ব্রত

মনুস্মৃতিতে বর্ণিত কচ্ছ্র বা কৃচ্ছ্র সাধনাগুলোর মধ্যে 'তপ্ত-কচ্ছ্র' অন্যতম কঠোর এবং তেজস্বী ব্রত। এটি মূলত শরীরের অভ্যন্তরে সঞ্চিত অতি অপবিত্রতা এবং গুরুতর পাপের সংস্কার দহন করার জন্য পালিত হয়।

তপ্ত-কচ্ছ্র ব্রতের স্বরূপ

​তপ্ত-কচ্ছ্র ব্রতটি মূলত বারো দিনের একটি প্রক্রিয়া। এই ব্রতে স্বাভাবিক শীতল জল বা খাদ্য গ্রহণ নিষিদ্ধ; পরিবর্তে কেবল গরম পানীয় বা দ্রব্য গ্রহণের বিধান দেওয়া হয়েছে। মনু মহারাজ এই ব্রতের নিয়মটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেন:

তপ্তাভিঃ সদ্ভিরদ্ভিস্তু তপ্তেন পয়সা তথা।তপ্তেন চৈব সর্পিষা তপ্তেনানিলেন চ।।একৈকং ত্রিদিনং ভুঙক্তে তপ্তকচ্ছ্রং তদুচ্যতে।। (মনুস্মৃতি ১১/২১৫)

ব্রতের চার পর্যায় (প্রত্যেকটি তিন দিন ব্যাপী):

  1. প্রথম তিন দিন: কেবল উষ্ণ বা গরম জল পান করে থাকতে হয়।
  2. দ্বিতীয় তিন দিন: কেবল উষ্ণ দুগ্ধ পান করতে হয়।
  3. তৃতীয় তিন দিন: কেবল উষ্ণ ঘৃত (ঘি) পান করতে হয়।
  4. অন্তিম তিন দিন: আহার বা পানীয় বর্জন করে কেবল উষ্ণ বায়ু সেবন করে (অর্থাৎ পূর্ণ উপবাস) থাকতে হয়।

​২. ব্রতের কঠোরতা ও নিয়ম

​এই ব্রতটি অত্যন্ত কঠিন কারণ এতে শরীরের তাপমাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এর প্রধান নিয়মগুলো হলো:

  • একবার আহার: প্রতিদিন কেবল একবার এবং নির্দিষ্ট পরিমাপে উষ্ণ দ্রব্য গ্রহণ করা যায়।
  • স্নান ও শৌচ: দিনে অন্তত একবার স্নান করে পবিত্র থাকতে হয়।
  • ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ: কায়মনোবাক্যে ব্রহ্মচর্য পালন এবং সত্যনিষ্ঠ থাকা বাধ্যতামূলক।

​৩. তপ্ত-কচ্ছ্র কেন পালন করা হয়?

​মনু মহারাজ এই ব্রতটিকে এমন সব পাপের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন যা মানুষের সাত্ত্বিক তেজকে গ্রাস করে ফেলে। যেমন:

  • গুরুতর অভক্ষ্য ভক্ষণ: ভুলবশত বা অজ্ঞানবশত অত্যন্ত ঘৃণ্য মাংস (যেমন নরমাংস বা পশুর মেদ) ভক্ষণ করলে।
  • অশৌচ স্পর্শ: অত্যন্ত অপবিত্র বস্তু বা ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে।
  • সুবর্ণ স্তেয় (স্বর্ণ চুরি): চুরির মতো অপরাধের মানসিক কলঙ্ক দূর করতে।
  • অধ্যাত্মিক পতন: ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বা স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে পুনরায় ধর্মে ফিরতে চাইলে।

​৪. আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

​তপ্ত শব্দের অর্থ উত্তপ্ত বা তপ্ত। শাস্ত্রে অগ্নিকে বলা হয় 'সর্বভুক' এবং 'পবিত্রকারী'। তপ্ত-কচ্ছ্র ব্রত পালনের মাধ্যমে সাধক নিজের শরীরের ভেতরে এক প্রকার কৃত্রিম 'তপ-অগ্নি' প্রজ্বলিত করেন।

  • মল শোধন: উষ্ণ জল, দুগ্ধ ও ঘৃত শরীরের নাড়ীগুলোকে পরিষ্কার করে এবং জঠরাগ্নিকে প্রজ্বলিত করে সঞ্চিত বিষ বা পাপের প্রভাব দূর করে।
  • সহনশীলতা: এই ব্রত পালনের মাধ্যমে মানুষের সহ্যশক্তি এবং আত্মিক বল চরমে পৌঁছায়।

​৫. সতর্কতা

​এই ব্রতটি অত্যন্ত কঠোর বিধায় এটি কেবল সুঠাম দেহ এবং প্রবল সংকল্পধারী ব্যক্তিদের জন্য বিহিত। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো দুর্বল, রুগ্ন বা বৃদ্ধ ব্যক্তির পক্ষে এই ব্রত পালন নিষিদ্ধ; তাদের জন্য বিকল্প দয়া বা দানের বিধান রয়েছে।

অক্ষম ও দুর্বলদের জন্য শাস্ত্রীয় লাঘব: বিকল্প প্রায়শ্চিত্ত ও দানের বিধান।

ধর্ম শাস্ত্র অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং বাস্তবসম্মত। মনুস্মৃতিতে যেখানে অত্যন্ত কঠোর ব্রত ও তপশ্চর্যার বিধান দেওয়া হয়েছে, সেখানেই আবার বালক, বৃদ্ধ, আতুর (রুগ্ন) এবং মহিলাদের জন্য বিশেষ দয়া ও বিকল্প ব্যবস্থার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। শাস্ত্রের মূল লক্ষ্য শরীর বিনাশ নয়, বরং চিত্তশুদ্ধি।

তপোবনের বিকল্প: ধেনু বা গো-দান

যারা তপ্ত-কচ্ছ্র বা চান্দ্রায়ণের মতো কঠোর উপবাস পালন করতে সমর্থ নন, তাদের জন্য 'ধেনু-দান' বা গাভী দানকে সমতুল্য প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

  • প্রাজাপত্যের বিকল্প: একটি দুগ্ধবতী গাভী এবং তার বৎসের সমমূল্য অর্থ বা সরাসরি গাভী দান করলে একটি প্রাজাপত্য ব্রতের সমান ফল লাভ হয়।
  • তপ্ত-কচ্ছ্রের বিকল্প: পাপের গুরুত্ব অনুযায়ী দুই থেকে তিনটি গাভী দান করার বিধান দেওয়া হয়েছে।
  • চান্দ্রায়ণের বিকল্প: আটটি গাভী দান করলে এক মাসের কঠোর চান্দ্রায়ণ ব্রতের সমতুল্য পাপক্ষয় হয়।

​৩. জপ ও নাম-সংকীর্তনের মহিমা

​শারীরিক শ্রম বা অর্থ দানেও যারা অক্ষম, তাদের জন্য পরম দয়ালু মহর্ষিগণ 'জপ' যজ্ঞের বিধান দিয়েছেন।

জপ্যেনৈব তু সংসিদ্ধ্যেব্রাহ্মণো নাত্র সংশয়ঃ। কুর্যাদন্যন্ন বা কুর্যাদ মৈত্রো ব্রাহ্মণ উচ্যতে।। (মনুস্মৃতি ২/৮৭)

​কঠোর ব্রতের পরিবর্তে পবিত্র গায়ত্রী মন্ত্র বা ওঙ্কার জপ করলে চিত্ত শুদ্ধ হয়। নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন লক্ষ বা দশ লক্ষ বার) পবিত্র মন্ত্র জপ করলে সঞ্চিত পাপের অন্ধকার দূর হয়। একে বলা হয় 'মানস তপ'।

​৪. ব্রাহ্মণ ও দরিদ্র সেবা

​যদি কারো গাভী দান করার সামর্থ্য না থাকে, তবে তিনি অত্যন্ত বিনয় ও ভক্তির সাথে বিদ্বান ব্রাহ্মণ বা অভাবী সজ্জন ব্যক্তিকে অন্ন দান করে আশিস প্রার্থনা করতে পারেন।

  • অন্নদান: বহুসংখ্যক ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে তৃপ্তিসহকারে ভোজন করানো কঠোর উপবাসের একটি কোমল বিকল্প।
  • ক্ষমা প্রার্থনা: অনুতপ্ত হৃদয়ে জনসমক্ষে নিজের অপরাধ স্বীকার করে মহৎ ব্যক্তিদের চরণ স্পর্শ করলে এবং তাদের আশীর্বাদ লাভ করলে পাপের ভার লাঘব হয়।

​৫. গীতাপাঠ ও শাস্ত্র শ্রবণ

​অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য শাস্ত্র শ্রবণ এবং পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করাকে পরম প্রায়শ্চিত্ত বলা হয়েছে। মনুস্মৃতির দর্শন অনুযায়ী, জ্ঞানাগ্নি সকল অশুভ কর্মফলকে ভস্মীভূত করতে পারে। তাই শুদ্ধ মনে ধর্মের বাণী শ্রবণ করলে আধ্যাত্মিক মালিন্য দূর হয়।

​৫. আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব

​যদিও বর্তমান যুগে এই কঠোর নিয়ম পালন করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও এর মূল দর্শন হলো মিতাহার এবং প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা। চন্দ্র মানুষের মনের কারক, তাই চন্দ্রের গতির সাথে আহারের নিয়ন্ত্রণ মনের ওপর অসামান্য আধিপত্য বিস্তার করতে সাহায্য করে।

উপসংহার:

মনুস্মৃতি কঠোরতার আড়ালে করুণার আধার। যদি সংকল্প দৃঢ় থাকে এবং অন্তরে প্রকৃত অনুতাপ থাকে, তবে সামান্য দান বা একনিষ্ঠ জপও কঠোর তপশ্চর্যার সমান ফল দান করতে পারে। সকলের কাছে আমাদে বার্তা এই যে, ধর্ম মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়, কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাস নয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

Advertisement