হিন্দু ধর্ম কেন সব থেকে শ্রেষ্ট ধর্ম?

ভূমিকা: ধর্ম কাকে বলে? ধর্মের প্রয়োজনীয়তা কি? এই বিষয়ে আমরা আগেও আলোচনা করেছি। তাই পাঠকদের সেই Blog টি পড়ার অনুরোধ করছি। আজ আমরা জানবো হিন্দু ধর্ম কেন সব থেকে শ্রেষ্ট। 

লোকসমাজে যত প্রকার ধর্মপ্রণালী বর্তমানে প্রচলিত আছে তাঁদের মধ্যে হিন্দুধর্মের মতো অন্য কোন ধর্মের এমন পরিণতি বা পরিপুষ্টি ঘটে নাই। কারণ হিন্দু ধর্ম অতি প্রাচীন বয়োজ্যেষ্ঠ। যা আবার সনাতন বৈদিক আর্য ধর্ম নামেও পরিচিত। হিন্দু শব্দটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়। শিখ, জৈন, বৌদ্ধ এবং বৈদিক সকলেই হিন্দু, সকলেই আর্য।

ধর্মের নামে গোঁড়ামিতে মহাপাতক, নরকের কারণ:

যে কোন ধর্মীদের জিজ্ঞাসা করো, “কোন্ ধর্ম ভাল?” সে তখনই বলিবে “আমার ধর্ম ভাল।” আমার গুরুদেব বলেছেন তাঁর পুস্তকে লিখে গেছেন ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করিতে নাই, ধর্মের নামে গোঁড়ামিতে মহাপাতক হয়। অন্যের ধর্মের নিন্দা নরকের কারণ। তাই, আমি সেই ভাবনা নিয়েই এই ব্লগ লিখছি। এ সবই তাঁর কথা। আমি সেগুলোই নিজের ভাষায় লিখছি । তিনি বলেছেন:-

সকলের বিচার-শক্তি, জ্ঞান-শক্তি ও অনুভব- শক্তি আছে। শুদ্ধ মনে অনুভব করুন, বিচার করুন, সাধন করুন, পথ পরিষ্কৃত হবে। যে ধর্ম আচরণ করলে মানুষ নিজ অভিজ্ঞতায় সমস্ত প্রত্যক্ষানুভব বা প্রত্যক্ষ দর্শন করিতে পারে, তাকেই শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা যায়। এইজন্য আমি হিন্দুধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।

হিন্দু মহাত্মারা ভগবানের প্রত্যক্ষ দর্শন করাতে পারেন।

কোনো ধর্মীয় অনুসারীদের যদি বলা হয় তোমরা কি ভগবান দেখেছ? তাঁকে দেখাতে পাবে? সে নানা যুক্তি দেখাবে না, তাঁকে এই চোখ দিয়ে দেখানো যায় না। তিনি এমন, অমন ইত্যাদি। এই একই প্রশ্ন নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ) ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে করেছিলেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, "হ্যা তোকে যতটা স্পষ্ট দেখি তার থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাই।" এই বলে তিনি নরেন্দ্রনাথের বুকে নিজের পা স্পর্শ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে নরেন্দ্র অচেতন হয়ে গেলেন এবং এমন ভবযুক্ত হলেন যে বেশ কিছুদিন তিনি বাহ্য জ্ঞান হারিয়ে থাকতেন। এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে ভক্ত শুধু ইশ্বর দর্শন করেছেন এমন নয়, অন্যকেও করিয়েছেন। 

Schizophrenia থেকে এটি একদম আলাদা:

Schizophrenia বলে একটা মানসিক রোগ আছে। যেখানে রোগী একজন মানুষকে দেখতে পায়, তার সঙ্গে কথা বলে, তাকে বিশ্বাস করে। এইসব মানুষেরা কিন্তু অন্যদের দেখাতে পারে না। সঞ্জয় দত্ত অভিনীত হিন্দী ফিল্ম মুন্নাভাই MBBS এ দেখানো হয়েছিলো তিনি গান্ধীজির সঙ্গে কথা বলতেন, তাকে দেখতে পেতেন। কিন্তু অন্যকেউ তাঁকে দেখতে পেতেন না। কিন্তু শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মতো মহাত্মা মহাপুরুষদের সেই অক্ষমতা নেই। তারা যাকে দেখেন, তাঁকে দেখতেও পারেন। এতটাই তাঁদের ক্ষমতা।

হিন্দু  ধর্মের স্বরুপ ও প্রতীক জানুন। 

হিন্দু ধর্মের ইশ্বর সম্পর্কে জানতে হলে ধর্মের স্বরুপ জানতে হবে। হিন্দুগণ ধর্মকে চতুষ্পাদ বৃষ বলে সংজ্ঞা দান করেছেন। হিন্দুরা গো পূজা করেন এর পেছনেও কারণ এই একই। ধর্মের প্রতীক।

যথা— বৃষো হি ভগবান্ ধর্মশ্চতুষ্পাদঃ প্রকীর্তিতঃ বৃণোমি ত্বামহং ভক্ত্যা স মাং রক্ষতু সর্বদা৷৷

—বৃষোৎসর্গপদ্ধতি

এই একই সূত্র ধরে আমরা মনুস্মৃতি থেকেও জানতে পারি। ভগবান মনু বলিয়াছেন—

বৃষো হি ভগবান্ধর্মস্তস্য যঃ কুরুতে হালং।বৃষলং তং বিদুর্দেবাস্তস্মাদ্ধর্মং ন লোপয়েৎ৷৷মনুসংহিতা

এখানে ধর্মকে চতুষ্পাদ বৃষ বলার উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য হলো ধর্মের চতুষ্পাদ সাধককে নির্দেশ করা। এখানে চতুষ্পাদ অর্থে চারিভাগে পূর্ণ। এক এক পাদ ধর্মাচরণে এক এক জগতের বোধ প্রাপ্তি হয় ও সেই বিষয়ে ইন্দ্রিয়শক্তির স্ফূর্তি, পরিণতি ও সামঞ্জস্য লাভ হয়ে থাকে। সেই ইন্দ্রিয়ের জ্ঞাত জগৎ চারিটি। 

কিভাবে ইশ্বর দর্শন সম্ভব?

চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা প্রভৃতি বহিরিন্দ্রিয়দ্বারা যে জগৎকে জানতে (বা অনুভব করতে) পারা যায়, তাহাকেই বহির্জগৎ বলে। ধর্মের প্রথম পাদের (শাস্ত্র সম্মত) আচরণ ও সাধনাদ্বারা এই বহির্জগৎ বশীভূত হয় ও তাহার উপর ক্ষমতা বিস্তার করা যায়। 

মন অন্তরিন্দ্রিয়—মনের বিষয় যে জগৎ তাহাই অন্তর্জগৎ। অন্তর্জগৎ বৃত্তিময়, বৃত্তি মানস-বিকার। ধর্মের দ্বিতীয় পাদের (শাস্ত্র সম্মত) আচরণ ও সাধনাদ্বারা এই জগৎ আয়ত্তীভূত হয়।  সংকল্প মাত্র বৃত্তি ও বিকার নিরোধিত হয়। মনের ক্ষমতাকে অন্যের ওপর আরোপ করা সম্ভব হয়।

সত্যেন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকে বৌদ্ধ জগৎ বলে। বুদ্ধিই সত্যেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য। ধর্মের তৃতীয় পাদ সাধনদ্বারা এক অদ্বিতীয় এবং সত্যস্বরূপ ভগবান্ আমাদের বুদ্ধির গম্য হন। এর দ্বারা তাঁকে জানা যায়, তাঁহাতে নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি আরোপিত হওয়ায় তাঁহার স্বরূপ দর্শন হয়।

আমার গুরুদেব এর পরে বলেছেন, "বিবেকগ্রাহ্য জগৎকে অধ্যাত্ম-জগৎ বলে। বিবেকই ধর্মজ্ঞানের সাধন। বিবেক যখন এক ব্রহ্ম ব্যতীত সকলকে তুচ্ছ (মনে) করিবে, তখনই ভগবানে গাঢ় প্রেমের সঞ্চার হবে।" ধর্মের চতুর্থপাদ সাধনায় এই ভগবৎপ্রেম লাভ হয়।

ধর্মের শ্রেষ্ঠতার মানদন্ড:

নিয়ম আচার বিচার আচরণ ভালো হলেই কোনো ধর্মের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ হয় না। কথায় আছে, "এক দেশের গালি অন্য দেশের বুলি"। নেপালি ভাষায় বাবার দাদাকে বাডা বলা হয়। এটা বাঙালিদের একটা খারাপ শব্দ। আবার তাদের ভাষায় আমাদের জ্যেঠা কথাটি তাদের জন্য একটি খারাপ শব্দ। তাই, মান দণ্ড এমন হওয়া উচিত যাহা সব ক্ষেত্রে, সকলের জন্য প্রামাণিক হতে হবে।

হিন্দু ধর্ম স্পষ্ট বলে, যোগ দ্বারা মানুষ দেবতুল্য হয়। আর দেখুন, সমগ্র বিশ্বকে এই যোগের আসন, প্রাণায়াম নিরোগী করতে সাহায্য করছে। তাই যে সম্প্রদায়ের ধর্মপদ্ধতি সাধন দ্বারা ইহা হয়, তাহাকেই শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা হয়।

অতঃপর: 

হিন্দুধর্মের বিধান পদ্ধতিতে ঐ চারিপ্রকার ইন্দ্রিয়-শক্তির স্ফূর্তি, সামঞ্জস্য ও পরিণতি হইলেই ঐ চারিজগতের তত্ত্বনির্ণয়ে সামর্থ্য ও সর্ববিষয়ে সিদ্ধিলাভ করতে পারা যায়, তাই হিন্দুধর্ম শ্রেষ্ঠ। এই পোষ্ট সম্পর্কে আপনার মতামত লিখুন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন
InterServer Web Hosting and VPS

Copying content is illegal

Please refrain from copying content.