সনাতন ধর্ম তার জন্মলগ্ন থেকেই মত ও পথের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে এসেছে। "যতো মত, ততো পথ"—এই মহামন্ত্রের উদ্গাতা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আজীবন সেই সমন্বয়ের বার্তাই দিয়ে গেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ইন্টারনেটে কিছু নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুসারীরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মরিয়া চেষ্টায় এই মহামানবের চরিত্রহননে লিপ্ত হয়েছেন।
‘ধর্মতত্ত্ব.com’ নামক একটি ওয়েবসাইটে (যার ২০২২ সালের জানুয়ারির একটি ব্লগ পোস্ট অত্যন্ত বিতর্কিত) শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনীর বিভিন্ন অংশকে প্রসঙ্গ-বহির্ভূত (out of context) ভাবে তুলে ধরে তাঁকে জাতপাত-সমর্থক, নারীবিদ্বেষী, মূর্খ এবং উন্মাদ হিসেবে প্রমাণের এক নির্লজ্জ অপপ্রয়াস করা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে যুক্তির কষ্টিপাথরে এই প্রতিটি অপপ্রচারের মুখোশ সম্পূর্ণভাবে উন্মোচন করব।
জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কুরুচিকর কটাক্ষ: এটি কি আর্য লক্ষণ?
অপপ্রচার: যিশুর কুমারী মাতার গর্ভে জন্মের মতো শ্রী রামকৃষ্ণের জন্মের ক্ষেত্রেও নাকি পিতার কোনো ভূমিকা নেই, এমন কথা বলে তাঁর দৈব জন্মকে অত্যন্ত কদর্য ভাষায় উপহাস করা হয়েছে।
বিস্তারিত খণ্ডন: যারা নিজেদের ‘আর্য’ বা নিখাদ বৈদিক বলে দাবি করেন, তাদের মুখেই এমন অনার্যসুলভ ও অবৈজ্ঞানিক দাবি মানায়! শ্রী রামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় গয়ায় গদাধরের (বিষ্ণু) স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন এবং মাতা চন্দ্রমণি দেবী কামারপুকুরে শিবমন্দিরে দৈবজ্যোতি দর্শন করেছিলেন।
সনাতন শাস্ত্রে ঈশ্বরানুকূল্যে বা দৈব উপায়ে সন্তানলাভের ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে। মহাভারতে মহারাজা পাণ্ডুর কোনো ঔরসজাত সন্তান ছিল না। মহর্ষি দুর্বাসার দেওয়া মন্ত্রবলে দেবী কুন্তী ও মাদ্রী ধর্মরাজ, বায়ু, ইন্দ্র এবং অশ্বিনীকুমারদের আহ্বানের মাধ্যমে পঞ্চপাণ্ডবকে লাভ করেন। কুমারী অবস্থায় সূর্যদেবের অনুগ্রহে কর্ণের জন্ম হয়। যদি শ্রী রামকৃষ্ণের দৈব জন্ম ‘হাস্যকর’ বা পিতার ভূমিকা ছাড়া অসম্ভব বলে মনে হয়, তবে ‘ধর্মতত্ত্ব.com’-এর লেখকরা কি পাণ্ডব বা কর্ণের জন্মবৃত্তান্তকেও একইভাবে উপহাস করবেন? আক্ষরিক অর্থে বা স্থূল জাগতিক দৃষ্টিতে বিচার করে কোনো আধ্যাত্মিক সত্যকে উপহাস করা নিছকই অজ্ঞতা এবং শাস্ত্রীয় জ্ঞানের অভাব প্রমাণ করে।
জাতপাত ও বর্ণবিদ্বেষের মিথ্যে অপবাদ
অপপ্রচার: রানী রাসমণির অব্রাহ্মণ হওয়ার কারণে রামকৃষ্ণ প্রথমে তাঁর মন্দিরে পৌরোহিত্য করতে অস্বীকার করেন। এছাড়া শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পুঁথি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, শেষজীবনে তিনি ব্রাহ্মণ ছাড়া কারও হাতের রান্না খেতেন না।
বিস্তারিত খণ্ডন: এটি একটি সুকৌশল বিকৃতি।
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রেক্ষাপট: ১৮৫৫ সালে যখন দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তৎকালীন গোঁড়া ব্রাহ্মণ সমাজ রানী রাসমণিকে কৈবর্ত (শূদ্র) হওয়ার কারণে ব্রাত্য করেছিল। কিন্তু প্রথম পৌরোহিত্য গ্রহণ করেন শ্রী রামকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তরুণ গদাধর শুরুতে ইতস্তত করেছিলেন কারণ তখনো তিনি ‘পরমহংস’ হননি; তিনি ছিলেন তৎকালীন স্মৃতিশাস্ত্র ও রঘুনন্দনের বিধানে আবদ্ধ এক সাধারণ, নিষ্ঠাবান পল্লিগ্রামের ব্রাহ্মণ যুবক।
ব্রাহ্মণ্য অহংকার বিনাশ: এই গদাধর যখন সাধনার পথে অগ্রসর হলেন, তখন সর্বপ্রথম তিনি নিজের জাতপাতের অহংকার চূর্ণ করার সংকল্প নেন। রাতের অন্ধকারে তিনি দক্ষিণেশ্বরের এক মেথরের (তৎকালীন সমাজের তথাকথিত অস্পৃশ্য) শৌচাগার নিজের মাথার দীর্ঘ কেশ দিয়ে পরিষ্কার করেছিলেন এবং কেঁদে বলেছিলেন, "মা, আমার ভেতর থেকে চণ্ডাল আর ব্রাহ্মণের ভেদ মুছে দে।" যিনি জাতপাতের কট্টর সমর্থক, তিনি কি কখনও এই কাজ করতে পারেন?
আহারের প্রসঙ্গ ও সত্ত্বগুণ: ‘কথামৃত’ বা ‘পুঁথি’-তে তাঁর ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্যের হাতের অন্ন গ্রহণ না করার যে উল্লেখ আছে, তা বর্ণবিদ্বেষ ছিল না। সাধনার চরম পর্যায়ে তাঁর শরীর অত্যন্ত সত্ত্বগুণসম্পন্ন (Sattvic) ও সংবেদনশীল হয়ে গিয়েছিল। আধ্যাত্মিক শুচিতা ও শুদ্ধাচারী মানুষের স্পর্শ ছাড়া তাঁর শরীর অন্ন গ্রহণ করতে পারত না। এমনকি অনেক অসৎ বা চরিত্রহীন ব্রাহ্মণের আনা খাবারও তিনি ছুঁতে পারতেন না, তাঁর হাত বেঁকে যেত। তিনি মানুষের জাত দেখতেন না, মানুষের ভেতরের ‘ভাব’ দেখতেন।
নারীবিদ্বেষ নাকি সাধকের ‘কামিনী-কাঞ্চন’ তত্ত্বের বৈরাগ্য?
অপপ্রচার: শ্রী রামকৃষ্ণ কথায় কথায় নারীকে "জঞ্জাল", "ভাগাড়" বলতেন। তিনি ভয়ংকর নারীবিদ্বেষী ছিলেন।
ষোড়শী পূজা: এটি শ্রী রামকৃষ্ণের সাধনার সবচেয়ে বড় অবমাননা। পৃথিবীর আধ্যাত্মিক ইতিহাসে শ্রী রামকৃষ্ণই একমাত্র অবতার বা সাধক, যিনি নিজ স্ত্রী শ্রী শ্রী মা সারদা দেবীকে ফলহারিণী কালীপূজার রাতে সাক্ষাৎ জগদম্বা জ্ঞানে পূজার বেদিতে বসিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছিলেন এবং প্রণাম করেছিলেন। যিনি নিজ স্ত্রীকে, তথা নারীজাতিকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করেন, তিনি কীভাবে নারীবিদ্বেষী হন?
কামিনী-কাঞ্চন ও বৈরাগ্য: তিনি ‘নারী’ জাতিকে জঞ্জাল বলেননি। সন্ন্যাসী ও সাধকদের জাগতিক মোহ থেকে দূরে রাখতে তিনি ‘কামিনী-কাঞ্চন’ (Lust and Greed) ত্যাগের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, অবিদ্যা রূপী নারী জগতকে মোহে আবদ্ধ করে, কিন্তু বিদ্যা রূপী নারী এই জগৎ সৃজন ও পালন করেন। তিনি গ্রাম্য ভাষায় উপমা দিয়ে বলেছেন, যে সাধক ঈশ্বরলাভের পথে নেমে আবার কামনার বশবর্তী হয়, সে যেন ভাগাড়ের উচ্ছিষ্ট চিবিয়ে নিজের মুখের রক্তকেই সুধা মনে করে। এই কঠোর সতর্কবার্তা কেবল পুরুষদের জন্য নয়, নারী সাধিকাদের ক্ষেত্রেও পুরুষদের প্রতি একই বৈরাগ্যের কথা তিনি বলেছেন। আধ্যাত্মিক পথের বৈরাগ্যকে নারীবিদ্বেষ বলে চালানোটা চরম মূর্খতা।
ভাবসমাধিকে ‘মাতলামি’ বা উন্মাদনা আখ্যা দেওয়া
অপপ্রচার: তাঁর কালী সাধনা, ভাবসমাধি বা ঈশ্বরপ্রেমে ক্রন্দনকে নিন্দুকেরা ‘কৈলাচার’, ‘মাতলামি’ বা ‘মানসিক রোগ’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
বিস্তারিত খণ্ডন: একজন সাধারণ মানসিক রোগী বা ‘হাবা-গোবা’ মানুষ কি স্বামী বিবেকানন্দের মতো একজন তর্কবাগীশ, যুক্তিবাদী এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত যুবককে পরাস্ত ও বশ করতে পারেন? যাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনে মুগ্ধ হয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী বা কেশবচন্দ্র সেনের মতো তৎকালীন বাংলার শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা ছুটে যেতেন, যাঁকে নিয়ে ম্যাক্স মুলার, রোমাঁ রোলাঁর মতো বিশ্ববরেণ্য মনীষীরা গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাঁকে উন্মাদ বলাটা সমালোচকদের চরম বৌদ্ধিক দেউলিয়াপনা। ঈশ্বরের প্রেমে বাহ্যজ্ঞান লোপ পাওয়া সনাতন ভক্তিবাদের (যেমন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর মহাভাব) এক চূড়ান্ত স্তর, যা শুষ্ক তার্কিকদের বোধগম্য হওয়া অসম্ভব।
প্রথাগত শিক্ষা ও শাস্ত্রজ্ঞানের অভাবের অপবাদ
অপপ্রচার: রামকৃষ্ণ প্রথাগত সংস্কৃত বা বেদ-উপনিষদ পড়েননি, তিনি অশিক্ষিত ছিলেন।
বিস্তারিত খণ্ডন: মুণ্ডক উপনিষদেই বলা হয়েছে বিদ্যা দুই প্রকার— 'পরা বিদ্যা' (আধ্যাত্মিক পরম জ্ঞান) এবং 'অপরা বিদ্যা' (পুঁথিগত ও জাগতিক জ্ঞান)। শ্রী রামকৃষ্ণের কাছে ছিল সেই 'পরা বিদ্যা'। তিনি তোতাপুরীর মতো দুর্ধর্ষ বেদান্তী সন্ন্যাসীর কাছে অদ্বৈত বেদান্তের চূড়ান্ত স্তর—নির্বিকল্প সমাধি—লাভ করেছিলেন মাত্র তিন দিনে, যা তোতাপুরীর নিজের আয়ত্ত করতে লেগেছিল দীর্ঘ চল্লিশ বছর! পুঁথি পড়ে যিনি ঈশ্বর সম্পর্কে তথ্য মুখস্থ করেছেন, আর যিনি ঈশ্বরকে সরাসরি দর্শন করেছেন—এঁদের মধ্যে কার জ্ঞান শ্রেষ্ঠ?
উপসংহার:
বাংলায় একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে— "আকাশের দিকে থুতু ছুঁড়লে তা নিজের গায়েই এসে পড়ে।" শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ বা আমাদের অন্যান্য ঋষি ও অবতাররা হলেন সেই ভাস্কর সূর্যের মতো, যাঁদের আধ্যাত্মিক আলোয় গোটা বিশ্ব আলোকিত। এখন কেউ যদি অন্ধ বিদ্বেষে বলে যে 'সূর্য নেই' বা 'সূর্যের আলো খারাপ', তাতে সূর্যের একবিন্দু ক্ষতি হয় না; বরং সেই নিন্দুকের নিজের অন্ধত্ব ও মূর্খতাই মানুষের সামনে প্রকট হয়ে ওঠে।
ইতিহাস সাক্ষী আছে, যুগে যুগে যারা মহামানবদের চরিত্রহনন করার বা সনাতন আদর্শকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেছে, কালক্রমে তারা নিজেরাই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে হারিয়ে গেছে। বর্তমান যুগে মানুষ অনেক বেশি সচেতন এবং যুক্তিবাদী। সাময়িকভাবে কেউ হয়তো খণ্ডিত তথ্য বা 'clickbait' দিয়ে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, কিন্তু সত্য যখন সামনে আসে, তখন ওইসব অপপ্রচারকারী ওয়েবসাইট বা গোষ্ঠীর বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে শূন্য হয়ে যায়। মানুষ বুঝতে পারে যে এদের মূল উদ্দেশ্য ধর্মপ্রচার নয়, বরং বিদ্বেষ ছড়ানো।
সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি হলো সত্য— "সত্যমেব জয়তে"। তাই অন্ধ বিদ্বেষের জবাব যখন গালাগালির বদলে যুক্তি, তথ্য এবং শাস্ত্রীয় শালীনতার মাধ্যমে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল নিন্দুকদের মুখোশই খুলে দেয় না, বরং সাধারণ মানুষের মনে সনাতন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আর্য সমাজ এবং স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর বেদ-নির্ভর আদর্শের প্রতি আমাদের পূর্ণ সম্মান থাকা উচিত। একজন হিন্দু হিসেবে আমরা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকেও ঠিক ততটাই সম্মান করি, যতটা স্বামী বিবেকানন্দকে করি। মতবিরোধ এবং শাস্ত্রীয় তর্ক থাকাটা একটি জীবন্ত ধর্মের লক্ষণ।
কিন্তু নিজেদের মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য ‘ধর্মতত্ত্ব.com’-এর মতো ওয়েবসাইটে শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনীকে বিকৃত করে গালাগাল করা কোনো সুস্থ সমাজ বা প্রকৃত আর্য সংস্কৃতির লক্ষণ হতে পারে না। আমরা যদি আজ পাল্টা বলতে শুরু করি যে, দয়ানন্দ সরস্বতী একজন ধর্ম ব্যবসায়ী, যিনি পুরাণ ও তন্ত্রের দেবী-দেবতাদের অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করে হিন্দু সমাজকে খণ্ডিত করেছেন—তবে কি সেটা খুব শোভন হবে? না, কারণ সেই কদর্যতা আমাদের সনাতনী সংস্কৃতি নয়।
আজকের হিন্দু যুবসমাজের কাছে আমাদের স্পষ্ট বার্তা: খণ্ডিত উদ্ধৃতির ফাঁদে পা দেবেন না। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ‘কথামৃত’ নিজে পড়ুন। প্রকৃত ধর্মবোধ আসে পরমতসহিষ্ণুতা এবং শাস্ত্রের সঠিক মর্মার্থ অনুধাবনের মাধ্যমে। অন্ধ বিদ্বেষ দিয়ে আর যাই হোক, ধর্ম রক্ষা করা যায় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন