কৃষ্ণ লীলার তত্ত্বজ্ঞান

শ্রী কৃষ্ণ নামটি হিন্দু ধর্মে ও সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়। শ্রীকৃষ্ণ কে? তার পরিচয় কি? শ্রীকৃষ্ণের বাণী গীতা আজ প্রত্যেক হিন্দু ঘরে ঘরে পাঠ হয়। কিন্তু এই কিছু কিছু মূর্খ ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণকে নারীঘটিত কেলেঙ্কারির সাথে এমনভাবে জড়িয়ে প্রকট করেন। ফলে আজকাল লোকে প্রায়শই বলে থাকে, “কৃষ্ণ করলে লীলা, আর আমরা করলে বিলাস?” আজ বিকেলে গোপিনীদের সাথে কৃষ্ণের রাসলীলা, নামক একটি নাস্তিক লিখিত ব্লগ পড়ছিলাম। এটি তার ভস্য দিয়ে তৈরি প্রতুত্তর। আসা করি ভালো লাগবে। 


শ্রী কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বতকে নিজের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে মাথার উপর তুলে রেখেছিলেন। সাত কি আট দিন ধরে। আপনি একটি পাঁচ কেজি বা তাঁরও কম ওজনের পাথর মাত্র দুই তিন ঘণ্টা তুলে রাখুন দেখি! 

আপনি যদি তাঁর লীলাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করতে চান? তবে দেখতে হবে শ্রী কৃষ্ণ কি তাঁর লীলাকে  ভক্তদের অনুকরণের শিক্ষা দিয়ে গেছেন? না জিনি ওই শাস্ত্র রচনা করেছেন তিনি বলেছেন। তাহলে আপত্তি কি? সবার প্রথমে জবাব দেওয়া দরকার এই শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধা কে?

রাধা ও কৃষ্ণ তত্ত্ব

পাণ্ডব গীতা গ্রন্থে বলা হয়েছে:— 

"ওঁ কৃষ্ণায় বাসুদেবায় হরয়ে পরমাত্মনে। প্রণত-ক্লেশনাশায় গোবিন্দায় নমো নমঃ।।"

এখানে 'বাসু' শব্দের অর্থ 'যিনি সর্বত্র বিরাজমান' এবং 'দেব' শব্দের অর্থ 'দ্যোতনশীল' বা 'প্রকাশক'। 

সুতরাং, 'বাসুদেব' শব্দের অর্থ দাঁড়ায় 'যিনি সর্বত্র বিরাজমান এবং সমস্ত বস্তুকে প্রকাশ করেন'। "প্রণত-ক্লেশনাশায়" অর্থাৎ "যিনি শরণাগতদের সমস্ত দুঃখ ও কষ্ট নাশ করেন। সেই গোবিন্দকে প্রণাম করি। 

গোবিন্দ শব্দটির অর্থ ও বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় — গো + বিন্দ। গো অর্থাৎ গাভী (গরু)। এছাড়াও  গো শব্দ ইন্দ্রিয়, পৃথিবী, জ্ঞান ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। বিন্দ অর্থাৎ পালনক, রক্ষাক বা স্বামী। অর্থাৎ জিনি এই ইন্দ্রিয়, পৃথিবী, জ্ঞান ও গাভী (গরু) পালনক, রক্ষক বা স্বামী সেই শ্রী কৃষ্ণকে আমি প্রণাম করি। 

রাধা কে?

শ্রী শ্রী রাধা হলেন শ্রী কৃষ্ণের আলহ্যদিনী শক্তি। সকল ভক্তের একত্রিত ভক্তির মূর্তির স্বরুপা। তিনি ভক্তির আধার। 

কেউ তাঁকে কাল্পনিক বলেন, কেউ তাকেই শ্রী কৃষ্ণের মহিমার উৎস বলেন। এই শ্রীরাধা তত্ত্ব না থাকলে শ্রী কৃষ্ণের অস্তিত্বই থাকতো না। সাংখ তত্ত্বের  প্রকৃতি ও পুরুষ এখানে রাধা ও কৃষ্ণ। আসলে জিনি রাধা তিনিই কৃষ্ণ। দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো সত্ত্বা নেই। 

গোপীকারা কে? 

গোপ গোপিকারা হলেন রাধার বিভিন্ন গুণ ঐশ্বর্য। হতো দেব দেবী আছেন। সকলেই গোপ ও গোপী। বৈষ্ণব শাস্ত্র মতে, গোপ-গোপীদের মধ্যে অনেকেই পূর্বজন্মে দেবতা বা ঋষির রূপে ছিলেন, এবং কৃষ্ণলীলায় অংশগ্রহণের জন্য গোপ ও গোপী রূপে জন্ম নিয়েছেন। ব্রহ্ম, শিব, নানান ঋষি এবং দেবীরা কৃষ্ণলীলায় যোগ দিতে চেয়েছিলেন এবং তপস্যার মাধ্যমে সেই অধিকার অর্জন করেছিলেন। 

শ্রী রাধাকে নিয়ে কিছুই বলা যায় না। কারণ, ভাষায় তাঁর বর্ণনা করা মুশকিল। রাধাকে বুঝতে হলে ভক্তের মনকে বুঝতে হবে। নিচে রাধা রহস্য।বর্ননা করবো।

অপরদিকে এমন কিছু লোকও দেখা যায়, যারা মনে করেন কৃষ্ণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষ।শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন:

"অবিজানন্তি মা মুঢ়া মানুষীম্‌ তনুম্‌ আশ্রিতম্‌।
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূত মহেশ্বরম্‌।।"
(ভগবদ্‌গীতা ৯.১১)

অর্থাৎ — “মূঢ় (অজ্ঞ) ব্যক্তিরা আমাকে মানবদেহে অবস্থানকারী একজন সাধারণ মানুষ বলে ভাবে। তারা আমার পরম, দিব্য ভাব এবং সমস্ত সৃষ্টি ও জীবের স্বামী মহেশ্বর রূপে আমাকে চেনে না।”

এমতাবস্থায় তাদের মনে শ্রী কৃষ্ণ লীলা নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা সত্য যে সত্যাসত্য কারো দাবীর উপর নির্ভর করেনা, নির্ভর করে তথ্য-প্রমাণের উপর। আর তথ্যপ্রমাণ যাচাই করলে দেখা যায়, সত্যই কৃষ্ণ হলেন পরব্রহ্ম ঈশ্বর। জগতের স্বামী বা নাথ। তিনি জগতপতি জগন্নাথ। 

তাই ওপরে একটি শ্লোক তথ্য-প্রমাণ হিসেবে দিয়েছি।  যেহেতু শাস্ত্রের ব্যাখ্যা শাস্ত্রের দ্বারাই সম্ভব তাই প্রমাণ হিসেবে শাস্ত্রীয় দর্শনকেই গ্রহণ করতে হবে। যাতে হিন্দু ধর্মের আদর্শ বা মতলব নিয়ে কারো সন্দেহ না হয়। 

সত্য যদি তিক্তই হয়, তবে জিনি সত্যান্বেষী তিনি সত্যকে বিকৃত করবেন না। সত্য যদি হজম না হয়, তবে অর্ধ সত্য বলা উচিত নয়। 

অতএব সত্য বলার নাম করে ভ্রান্তি বিচার প্রচার করা অনুচিত। কৃষ্ণের চরিত্র হনন করার চেষ্টা নিয়ে যারা দিনরাত পরিশ্রম করেন। আসুন দেখি  সেই শ্রী কৃষ্ণ আসলে কি এমন কাজ করছে।

তারা শ্রী কৃষ্ণের লীলাকে নারী ঘটিত প্রেম কাহিনী হিসেবে নিন্দা করে থাকেন। কৃষ্ণ করলে লীলা, এই লীলা কি সেটা না জেনেই ছি ছি করবেন না। দেখা গেল আপনি যে আয়না পরিষ্কার করছেন, সেই আয়নাতে কোনো দাগ নেই। বরং আপনার চোখেই সেই দাগ।

তাই প্রথমে আমরা বিরজার কথা দিয়ে শুরু করি। খুব সংক্ষেপে বলবো।

শ্রীকৃষ্ণ ও বিরজা

বিরজা হলেন এক দেবী, যিনি শ্রী রাধার অংশ এবং সেই অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরও শক্তিরূপা। গোলক ধামে তিনি শ্রী কৃষ্ণের লীলা সঙ্গিনী ছিলেন। শ্রী রাধার ভয়ে বিরজা দেহ ত্যাগ করে নদীতে পরিণত হয়। ওই নদী গোলোকধাম বর্তুলাকারে ব্যপ্ত হয়। ঐ নদী প্রস্থে দশযোজন বিস্তৃত ও অতি গভীর এবং দৈর্ঘ্যে তার চাইতে দশগুণ। ঐ নদী মনোহর ও বহুবিধ রত্নের আধার। সেই নদী যখন মর্তে আগমন করেন। তাই তাঁকে বিরজা নদী বলেও অভিহিত করা হয়।

সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করলেই বুঝতে পারবেন যে এই কাহিনী আসলে একটি তত্ত্ব কথা। যাহা শ্রী কৃষ্ণ ও রাধিকার মাধুর্য দিয়ে রচিত হয়েছে। যেভাবে, বিজ্ঞানের তত্ত্ব গুলোকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। আধ্যাত্মিক জ্ঞানকে এই ভাবেই দেবী দেবতাদের লীলা রূপে লেখা হয়। 

অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনী গুলোতেও এই ধরনের রূপক ও প্রতীকী ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে অতি গুহ্য আধ্যাত্মিক তত্ত্বও মনে রাখা সহজ হয়। শাস্ত্রীয় দর্শনকে কাহিনীর মাধ্যমে বোঝানোর জন্য এটিই সহজ পন্থা। কারণ,  আমাদের মনে কাহিনী গুলো খুব সহজেই দাগ কেটে থাকে। অজ্ঞ ও পাষণ্ড ব্যক্তিরা এই তত্ত্ব গুলোকে বাস্তব শ্রী কৃষ্ণের জীবনী মনে করে ভগবত তত্ত্বকে নিন্দা করে। 

এখানে বিরজা, রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের এই কাহিনীও সেই ধরনের একটি আধ্যাত্মিক তত্ত্বকে উপস্থাপন করে, যা ভক্তি, বিশুদ্ধতা ও পরমাত্মার সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে। 

কাহিনীর প্রতীকীর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা:

শ্রীকৃষ্ণ ও বিরজার সম্পর্ক: এটি শ্রীরাধার ঐশ্বর্য (বিরজা) ও পরমাত্মা (শ্রীকৃষ্ণ) -র মধ্যে সম্পর্ক। 'বিরজা' শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে, যেখানে এবং 'রজ' মানে 'ময়লা' বা 'অশুদ্ধি'। তার সঙ্গে ‘বি’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে— "রজ বিহীন", এই অর্থ প্রকাশ করে। 

সুতরাং, 'বিরজা' শব্দের অর্থ হলো 'বিশুদ্ধ' বা 'অশুদ্ধিহীন'। এটি আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতার প্রতীক। তাই নদীর জল রজ ধৌত করে। গোলক ধামে যেতে গেলে বিরজা নদীতে স্নান করে যেতে হয়।

রাধার ক্রোধ ও বিরজার নদীতে পরিণত হওয়া: রাধা এখানে ভক্তির প্রতীক। একদিকে ভক্তি (রাধা) এবং অন্যদিকে শুদ্ধতা বা শৌচতা (বিরজা)। উভয়ই ঈশ্বরের প্রিয়। 

যদি এদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তবে ভক্তির প্রতাপে শৌচতা নিজের দেহ ত্যাগ করে নদীর মতো প্রবাহিত হয়। সেই বিরজা পৃথিবীতে কালিন্দী বা যমুনা নদী।

পৃথিবীর অন্যান্য নদীরাও তার অংশ এবং সপ্তসাগরও বিরজা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। অর্থাৎ জলের মধ্যেও ঈশ্বরের প্রেম আছে। তাই জল দিয়ে রজ বা ময়লা ধৌত হয়।

তুলসী ও শ্রী কৃষ্ণ

তুলসী একটি গুল্ম। কিন্তু এর মহিমাকে রচনা করা হয়েছে শ্রী কৃষ্ণ এবং রাধা রানীর লীলা কাহিনী দিয়ে। এই তুলসী আসলে শ্রী শ্রী রাধারানীর অংশ। তাই, নিজের অংশের প্রতি রাধিকার মালিকানা অধিকার। রাধার সেবিকা হয়ে কৃষ্ণের প্রতি আকর্ষন রাধাকে ঈর্ষান্বিত করেছে। যদিও এই তুলসী স্বয়ং দেবী বৈষ্ণবী বা লক্ষ্মী। তত্ত্ব প্রসঙ্গে তিনি কৃষ্ণের দাসী। নাটকের নায়ক স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণ জিনি লক্ষ্মি পতি শ্রী হরি বিষ্ণু।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে তুলসীদেবী নিজে বর্ণনা করছেন। তিনি বলেছেন, “আমি তুলসী, আমি পূর্বে গোলোকে গোপিকা ছিলাম, শ্রীকৃষ্ণের কিঙ্করী হয়ে সবসময় তার সেবা করতাম। আমি রাধার অংশসম্ভূতা এবং তার প্রিয়তম সখী ছিলাম। একসময়ে আমি রাসমণ্ডলে গোবিন্দের সাথে ক্রীড়া-কৌতুক ভোগ করে মূর্ছিত হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। সেই সময়ে রাসেশ্বরী রাধিকা হঠাৎ সেই স্থানে আগমন করে আমাকে সেই অবস্থায় দেখতে পান ।" 

এই কথাগুলি ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের (প্রকৃতি খণ্ড) তুলসী মহাত্ম্য অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে তুলসী দেবীর আদি পরিচয় ও তাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তির কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। 

"তুলসী" । নামের মধ্যেই তুলসী শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা আছে। "তুলস্ + ঈ" → তুলনা করা যায় না এমন, অতুলনীয়। "তুলস্" = তুলনা "ঈ" = নারীজাতক প্রত্যয় অর্থ: যার তুলনা নেই, যিনি অতুলনীয়। তাঁর আরেক নাম বৈষ্ণবী, কারণ তিনিই শ্রীবিষ্ণু বা কৃষ্ণের প্রিয়তমা।

রাসমণ্ডলে গোবিন্দের সাথে ক্রীড়া-কৌতুক ভোগ করতে করতে তিনি মূর্ছিত হয়ে পড়েন। সেই সময়ে রাসেশ্বরী রাধিকা হঠাৎ সেই স্থানে আগমন হয়। এবং ওই মূর্ছিত অবস্থায় তুলসীকে শ্রী কৃষ্ণের কোলে অনত অবস্থায় দেখতে পান। 

তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্ধ হয়ে গোবিন্দকে অনেক ভর্ৎসনা করলেন এবং তুলসীকে এই বলে অভিশাপ দিলেন, “পাপিষ্ঠে! তুই মনুষ্য যোনিতে জন্মগ্রহণ কর।” (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ/ প্রকৃতিখণ্ড/ ১৫ অধ্যায়)

এরপর তিনি অসুর রাজ শঙ্খচূড়ের পত্নী রূপে জন্ম গ্রহন করেন। সেখানেও বিষ্ণু শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে তুলসীকে আলিঙ্গন করেন। এতে করে তুলসীর প্রতিব্রত নষ্ট হয়। ক্রোধ বশে তুলসী শঙ্খচূড় রুপী বিষ্ণুকে অভিশাপ দেন — "তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছ, তাই তুমি পাথরে পরিণত হবে!" সেই পাথরের রূপ হলো শালিগ্রাম শিলা।

একই ঘটনা অন্য এক পুরাণে জলন্ধর নামক রাক্ষসের আছে। এখানে জলন্ধর ছিলেন শিবের ত্বেজ থেকে জন্মানো সমুদ্রের পুত্র। পুরাণ অনুসারে, জালন্ধর ও শঙ্খচূড় একই ব্যক্তি। 

তিনি পূর্ব জন্মে ছিলেন স্বর্গের গন্ধর্ব রাজা "সুধন্বা", যিনি একসময় দেবগণের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন। একবার তিনি শ্রীকৃষ্ণের গুণগান শুনে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে অবজ্ঞা করেন। এই কারণে ব্রহ্মা তাঁকে রাক্ষস হয়ে জন্মানোর জন্য অভিশাপ দেন। যার ফলে তিনি শঙ্খচূড় বা জালন্ধর নামে এক অসুর হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতিখণ্ডের ৫৫ অধ্যায়েও আছে। এখানে বলা হয়েছে, “ একদিন তুলসীবনে তুলসী গোপীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ ক্রীড়াসক্ত হলে শ্রীরাধিকা মানিনী হয়ে প্রিয়তম শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে অন্তর্হিত হন। রাধা লীলাক্রমে তার নিজমূর্তি ও কলার বিনাশ করলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব প্রভৃতি দেবতাদের ঐশ্বর্য নষ্ট হয়, তাঁরা শ্রী শূণ্য ভার্যাহীন হয়ে পড়েন এবং রোগ প্রভৃতি দ্বারা পীড়িত হতে থাকেন।” তখন সকল দেবতারা কৃষ্ণের শরণাগত হন। এরপর শ্রী কৃষ্ণ রাধার স্তব করে রাধাকে শান্ত করেন।”

"বৃন্দা" শব্দের অর্থ হলো গুচ্ছ। তিনি শ্রীমতী রাধার অতুলনীয় রূপ তুলসী। তিনি রাধার, মহিমা ও গুণাবলীর গুচ্ছ। তাই তুলসী গুচ্ছকে বৃন্দাবন বলা হয়। যেখানে শ্রী কৃষ্ণ রাধারানীর সঙ্গে মিলিত হতেন। বৃন্দা হলেন রাধার প্রেমের এক গুচ্ছ বা বহিঃপ্রকাশ।

স্বধা - স্বাহা এবং শ্রী কৃষ্ণ

স্বধা এবং স্বাহা উভয়েই ব্রহ্মার কন্যা এবং অগ্নির স্ত্রী  বৈদিক ও পৌরাণিক শাস্ত্রে তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এদের সরাসরি গুরুত্ব যজ্ঞ ও শ্রাদ্ধ কর্মের সঙ্গে।

১. স্বধা দেবী

স্বধা হলেন পিতৃলোকের (পিতৃপুরুষদের) উদ্দেশ্যে নিবেদিত অর্ঘ্যের (উপহার বা তর্পণ) দেবী। পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ (পিণ্ডদান) করার সময় "স্বধা" উচ্চারণ করা হয়। তিনি পিতৃলোকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং তাঁর আশীর্বাদে পিতৃপুরুষরা পরিতৃপ্ত হন। স্বধার বিবাহ হয় পিতৃলোকের সাথে।

স্বধার গুরুত্ব: গীতায় (৯.২৫) বলা হয়েছে, যারা পিতৃপুরুষদের পূজা করেন, তারা মৃত্যুর পরে পিতৃলোকে গমন করেন। তাই, স্বধা দেবীর আরাধনা করলে পিতৃপুরুষরা সন্তুষ্ট হন এবং পরিবার কল্যাণ লাভ করে।

২. স্বাহা দেবী

স্বাহা হলেন যজ্ঞের অগ্নিদেবের আরেক পত্নী এবং যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের আহুতি গ্রহণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। যেকোনো যজ্ঞে আহুতি দেওয়ার সময় "স্বাহা" উচ্চারণ করা হয়।

স্বাহার গুরুত্ব: যজ্ঞে যদি "স্বাহা" বলা না হয়, তবে দেবতারা আহুতি গ্রহণ করেন না। ঋগ্বেদ এবং অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রে স্বাহা দেবীকে অগ্নিদেবের শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি সমস্ত যজ্ঞের সফলতা ও দেবতাদের প্রসন্নতার কারণ। দেবতারা যেখানে বাস করেন তিনি সেই দেবলোক বা স্বর্গলোকের দেবী। 

স্বাহার অর্থ বিচার

এবার স্বধা - স্বাহার অর্থ ধরে বিচার করবো। 

স্বাধা কথার অর্থ হলো— জিনি বক্ষে ঈশ্বরকে ধারণ করেছেন। এবং স্বাহা কথার অর্থ হলো— জিনি নিজেকে ঈশ্বরের বুকে অর্পণ করেছেন। 

অর্থাৎ, আপনি ঈশ্বরকে গ্রহণ করুন বা ঈশ্বর আপনাকে গ্রহণ করুন। আপনি তো সেই ঈশ্বরের প্রেমকেই বিকশিত করছেন। দেবতারা স্বর্গে বাস করেন, আর পিতৃরা পিতৃলোকে।  এরা তো ঈশ্বরেরই রূপ। 

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতে হলে এখানে শ্রী কৃষ্ণকে ব্যাসদেব যজ্ঞ এবং অগ্নী রূপে অঙ্কলন করার চেষ্টা করেছেন। কারণ আদিতে নারায়ণ যজ্ঞ রূপেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। 

যজ্ঞই ইন্দ্রের পদ গ্রহন করেছিলেন। তাই স্বধা - স্বাহা উভয়ই শ্রী রাধিকার শক্তি। তাই, তিনিই নিজের গুণের বিস্তার করেছেন। 

এভাবে, সকল পুরাণ গুলো পরস্পর পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। তত্ত্ব বিহীন তর্ক করে কোনো লাভ নেই। সত্য তিক্ত নয়। সঠিক ভাবে গ্রহন করা কঠিন। তাই এরকম গন্ড মূর্খের কাছে তিক্ত বা কষ্টা মনে হয়।  

সুধী পাঠক, এখন আমরা শ্রী শ্রী রাধিকা রানীর রহস্যের মহত্ত্ব জানবো।

রাধা রহস্য: 

শ্রীরাধা কে বলা হয় শ্রীকৃষ্ণের অ্যালহাদিনী শক্তি। আসলে তিনিই ভক্তের মনে যে প্রেম, বাৎসল্য, সখ্য, দাস্য যে পাঁচ প্রকার ভাব আছে, তাঁর উৎস। শাক্তদের দেবী মহামায়া, বৈষ্ণবদের বৈষ্ণবী, শৈবদের শিব। সকলের উৎস শ্রী শ্রী রাধিকা। ভক্তিরসের এই প্রবাহমান ধারাই হলেন রাধা। 

গোপিকা গন সেই ভক্তিরসের প্রবাহমান ধারার উপধারা। আগেও বলেছি আবার বলছি। ব্রহ্ম, শিব, নানান ঋষি এবং দেবীরা শ্রী শ্রী রাধারই বিভিন্ন ভাব। যদি আপনি শিবের ভক্ত হন। তবে তাকেই সব মনে করুন। কালীর ভক্ত হলে তাঁকেই সব মনে করুন। আপত্তি নেই, কিন্তু যদি আপনি ভেদাভেদ করতে শুরু করেন। তবে আপনি মূর্খ।

রাধা কৃষ্ণের প্রেমকে বলা হয় "কান্তা"। যেখানে ঈশ্বর আর ভক্তের কোনো ভেদ থাকে না। তথা, ঈশ্বর ভক্ত হয়ে যাক আর ভক্ত ঈশ্বর। কোনো পার্থক্য নেই। বামা ক্ষেপা মা তারাকে প্রসাদের থালা থেকে খাওয়ার তুলে নিজে খেতেন, তারপর এটো করে খাওয়াতেন। আর যখন মন্দিরের পান্ডারা তাঁকে পিটিয়ে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দিলেন। মা তারাও মন্দিরের দরজা বন্ধ করে বসে পড়লেন। অর্থাৎ, ঈশ্বর আসলে আড়ম্বর পছন্দ করেন না। 

যখন আপনি রাধার মতো সরল হয়ে, আমিত্ব ত্যাগ না করে, কেবল পবিত্রতা, ভক্তি, বিধান নিয়ে পরে থাকবেন, বা ঈশ্বরের কৃপার উপর ভিত্তি করে ঈশ্বরের প্রেম আশা করবেন। তখন আপনি ভক্তির নামে গোড়ামিই করবেন। আজকাল এই গোঁড়ামি চোখে পড়ে।

বেশি কিছুই। ঈশ্বর প্রেমকে জাতি, সমাজ, আর সম্প্রদায় থেকে সামান্য উর্ধ্বে তুলতে হবে। একটু উদার ও সরল হতে হবে। যে যেমন খুশি তাঁকে সেভাবেই উৎসাহ দিতে হবে। আর হাতি, গো, ব্রাহ্মণ, ও কুকুরে সমান দৃষ্টি রাখতে হবে।

"বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ।।"

বাংলা অনুবাদ:

"যিনি প্রকৃত জ্ঞানী, তিনি সমদৃষ্টিসম্পন্ন হন। তিনি বিদ্বান ও বিনয়ী ব্রাহ্মণ, গরু, হাতি, কুকুর এবং চণ্ডাল (শ্বপাক) - সবার প্রতি সমানভাবে দৃষ্টি রাখেন।"

এই কাজ কঠিন তবে অসম্ভব নয়। 

তাই, সারাদিন কৃষ্ণ কৃষ্ণ করেও ঈশ্বরের শক্তি রাধা দ্বারা ভক্তরা রাধা রানীর ভৎসনা প্রাপ্ত হন। যেখানে রাধার অংশ বিমলা, কমলাকে শ্রী কৃষ্ণের কাছে দেখলে তিনি সহ্য করতেন না। আপনি কে হে?

শ্রী কৃষ্ণের নিকট তিনি নিজেকেই দেখতে চান। তাই, সকলের কৃষ্ণ প্রাপ্তি হয় না। তাঁর শক্তিতেই জীবকে জন্ম জন্মান্তরে ঘুর পাক খেতে হয়। কৃষ্ণকে রাধার মতোই  প্রেম ও জ্ঞান মিশ্রিত সুধা দিয়ে আপন করতে হবে। এটাই রাধা রহস্য। 

উপসংহার:

শেষে ব্লগার জানতে চেয়েছেন —

এমন স্বভাবের কৃষ্ণকে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের অনেক স্থানে পরমাত্মা বলা হয়েছে। কিন্তু পরমাত্মার চাইতে দুরাত্মার সাথেই তার বেশি মিল দেখা যায়। ধর্মগ্রন্থের এইসব চরিত্র থেকে মানুষ ঠিক কি শিক্ষা পাবে?

সমস্যা হলো, পরমাত্মা না ভেবে আপনি যদি দুরাত্মা ভেবেই তাঁর সম্পর্কে জানতে চান। সেখানে আপনি কোনো ভাবেই তাঁর চরিত্রের সঠিক বিচার করতে পারেন না। একে বলা হয় পূর্বপক্ষ দোষ। আপনি তো সমালোচনার দৃষ্টিতেই দেখছেন। তত্ত্বের দৃষ্টিতে নয়। তাই আপনি আপনার জায়গায় একদম ১০০% ঠিক আর আমি আমার জায়গায়।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কি নিজের ভুল ধারনা ত্যাগ করে মূল ধারণা গ্রহন করবেন নাকি নিজের বক্তব্য পুষ্ট করতে শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত স্বীকার করে নিজের মতই চলবেন। 

যে ব্যক্তি শাস্ত্রকে ভক্তির দৃষ্টিতে পড়বে, সে কৃষ্ণের প্রেমময় রূপ উপলব্ধি করবে। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র যুক্তিবাদী বা সমালোচকের দৃষ্টিতে পড়বে, সে প্রকৃত সত্য বুঝতে পারবে না।

যো যো যাম্‌ তানু ভজতি, তস্য তস্যাচলাং শ্রদ্ধাম্।" (গীতা ৭.২১)
যে যে ভাব নিয়ে ভগবানকে স্মরণ করবে, সে সেই রূপেই তাঁকে দর্শন করবে।

কবির, মীরা বাই, চৈতন্য মহাপ্রভু—তাঁরা রাম ও কৃষ্ণকে প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে উপলব্ধি করেছেন। তারা কি সমাজে এমন কিছু প্রচার করেছেন যেখানে নৈতিক অবনতি হয়েছে? কৃষ্ণ ভক্তদের মধ্যে কি সেইরকম বহু স্ত্রী সম্ভোগের চেষ্টা আছে? নাকি তারা অবৈধ সম্পর্ককে বৈধতা দেয়? 

শ্রদ্ধাময়ো'য়ং লোকঃ" (চান্দোগ্য উপনিষদ ৩.১৪.১)
 মানুষের অন্তরের বিশ্বাসই তার জ্ঞান ও উপলব্ধির মূল ভিত্তি।

বলার মতো অনেক কিছুই আছে কিন্তু আর কিছুই বলার নাই। কারণ এই আলোচনার উদ্দেশ্য রাধা কৃষ্ণের চরিত্রকে স্পষ্ট করে তুলে ধরা। 

ধন্যবাদ!

1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
Hostinger Black Friday Sale – Starting from ₹129/mo Promotional banner for Hostinger Black Friday deal: AI website builder, free domain, extra months. Pre-book now. Black Friday Sale Bring Your Idea Online With a Website From ₹129.00/mo + Extra Months & Free Domain Pre-Book Now HinduhumAds

Advertisement

Hostinger Black Friday Sale – Starting from ₹129/mo Promotional banner for Hostinger Black Friday deal: AI website builder, free domain, extra months. Pre-book now. Black Friday Sale Bring Your Idea Online With a Website From ₹129.00/mo + Extra Months & Free Domain Pre-Book Now HinduhumAds