Products
0

Introduction 

'মুক্তি' বা 'মোক্ষ' নিয়ে মানুষের মনে নানা কল্পকাহিনী আছে— মৃত্যুর পর স্বর্গে যাওয়া বা কৈলাসে স্থান পাওয়া ইত্যাদি। কিন্তু তন্ত্র অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলছে  মোক্ষ বা মুক্তি আকাশের ওপরে (স্বর্গে) নেই, পাতালে নেই। তাহলে কি স্বর্গ নরক এগুলো কাল্পনিক? কাল্পনিক নয় বাস্তব তবে সেভাবে নয় যেভাবে আমরা জানি। শাস্ত্রে এর পরিষ্কার বর্ণনা করেছেন ভগবান শিব। আসুন দেখি:

ন মোক্ষো নভসঃ পৃষ্ঠে ন পাতালে ন ভূতলে।
সর্বাশাসংক্ষয়ে চেতঃক্ষয়ে মোক্ষো নিগদ্যতে॥ (মূল শ্লোক (কূলার্ণব তন্ত্র, ১ম উল্লাস)

অনুবাদ: মোক্ষ বা মুক্তি আকাশের ওপরে (স্বর্গে) নেই, পাতালে নেই, এমনকি পৃথিবীর কোনো তীর্থেও নেই। সমস্ত রকম জাগতিক আশার (Desire/Expectations) অবসান হলে চিত্তের বা মনের যে নিরোধ (লয়) অবস্থা তৈরি হয়, তাকেই প্রকৃত মোক্ষ বলা হয়।

তন্ত্রের উদ্দেশ্য সম্মোহন, উচাটন, মারণ, বিদ্বেষণ নয়। তন্ত্র সাধনা মুক্তি বা মোক্ষের কথা বলে। এই মুক্তি বা মোক্ষ কি? এ নিয়ে গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন। তাই এখানে আর বলছি না। তবে এর পেছনের দর্শন আপনকে বলতে পারি। 

দার্শনিক জ্ঞান: মুক্তি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি মনের একটি চূড়ান্ত স্বাধীন অবস্থা। যতক্ষণ মানুষের মনে ' চাওয়া-পাওয়ার' বা 'না পাওয়া'-র আশা বা ভয় থাকে, ততক্ষণ সে বদ্ধ। মনস্তাত্ত্বিক ভাবে, মানুষের সমস্ত দুঃখের কারণ হলো তার চাওয়া পাওয়া বা কামনা। যোগ ও তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে সাধক যখন নিজের মনকে সমস্ত জাগতিক মোহ ও কামনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে ফেলেন, তখন তাঁর সেই স্বাধীন, ভয়শূন্য ও পূর্ণাঙ্গ মানসিক অবস্থাই হলো মোক্ষ।

তন্ত্রশাস্ত্রে সাধকের মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিবর্তনের যে তিনটি স্তরের কথা বলা হয়েছে, তাকে একত্রে 'ত্রিভাব' (পশু ভাব, বীর ভাব এবং দিব্য ভাব) বলা হয়। এটি কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের বিভাজন নয়, বরং একজন মানুষের চেতনার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র। 

এই তত্ত্বের সবচেয়ে প্রামাণিক এবং বিশদ আলোচনা পাওয়া যায় 'কুলার্ণব তন্ত্র', 'রুদ্রযামল তন্ত্র' এবং 'মহানির্বাণ তন্ত্র'-এ। আপনার নিজস্ব জ্ঞানানুশীলনের জন্য মূল সংস্কৃত শ্লোক ও তার দার্শনিক মনস্তত্ত্ব নিচে পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করা হলো:

পশু ভাব (Pashu Bhava - বদ্ধ বা শর্তসাপেক্ষ মন)

আধ্যাত্মিক যাত্রার একেবারে প্রাথমিক স্তর এটি। তন্ত্রের ভাষায়, সাধারণ মানুষ যারা জাগতিক মায়া, সংস্কার এবং সমাজের নিয়মে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, তারাই 'পশু' পর্যায়ভুক্ত। এখানে 'পশু' বলতে জন্তু-জানোয়ার বোঝায় না; 'পাশ' (দড়ি বা শৃঙ্খল) দ্বারা যে বদ্ধ থাকে, তাকেই পশু বলা হয়।

মূল শ্লোক : "ঘৃণা শঙ্কা ভয়ং লজ্জা জুগুপ্সা চেতি পঞ্চমী। কুলং শীলং তথা মানং অষ্টৌ পাশাঃ প্রকীর্তিতাঃ॥ পাশবদ্ধো ভবেৎ জীবঃ পাশমুক্তঃ সদাশিবঃ॥"(কুলার্ণব তন্ত্র, ১৩শ উল্লাস)

বঙ্গানুবাদ: ঘৃণা, শঙ্কা (সংশয়/দ্বিধা), ভয়, লজ্জা, জুগুপ্সা (নিন্দা বা সঙ্কোচ), কুল (বংশের অহংকার), শীল (সমাজের সংস্কার বা প্রথা) এবং মান (অহংকার)— এই আটটি হলো মানুষের মনের মূল শৃঙ্খল বা পাশ। এই আটটি পাশে যে বদ্ধ, সেই হলো সাধারণ জীব (পশু); আর এই পাশগুলো থেকে যে সম্পূর্ণ মুক্ত, সেই হলো স্বয়ং শিব। 

দার্শনিক মনস্তত্ত্ব (Psychological Insight): মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি হলো কন্ডিশন্ড মাইন্ড (Conditioned Mind)। এই স্তরে মানুষের মন দ্বৈতবোধে (Duality) ভোগে— কোনটা শুদ্ধ, কোনটা অশুদ্ধ; লোকে কী বলবে; আমার সম্মান চলে যাবে কি না। পশুভাবাপন্ন সাধক বাহ্যিক শুচিতা, নিয়মকানুন এবং মূর্তিপূজায় বেশি জোর দেন, কারণ তার নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। এই আটটি ভয় ও সংস্কারকে জয় না করা পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত আধ্যাত্মিক মুক্তি অসম্ভব।

বীর ভাব (Vira Bhava - সংগ্রাম ও জাগরণের স্তর)

এটি হলো উত্তরণের বা বিদ্রোহের স্তর। পশুর স্তর থেকে দিব্য স্তরে যাওয়ার সেতু হলো 'বীর ভাব'। যে সাধক সমাজের ওই আটটি মানসিক শৃঙ্খল (অষ্টপাশ) ভেঙে ফেলার সাহস রাখেন এবং নিজের ভেতরের রিপুগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের জয় করেন, তন্ত্রে তাকেই 'বীর' বলা হয়।

মূল শ্লোক : "ইন্দ্রিয়াণি মনশ্চৈব যস্য বশ্যানি সর্বদা। স বীর ইতি বিজ্ঞেয়ো ন শারীরবলাম্বিতঃ॥"(কুলার্ণব তন্ত্র, ১৭শ উল্লাস)

বঙ্গানুবাদ: যাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং মন সর্বদা নিজের বশীভূত থাকে, তাঁকেই প্রকৃত 'বীর' বলে জানা উচিত। কেবল শারীরিক বল বা পেশিশক্তির অধিকারী হলে তাকে বীর বলা যায় না।

দার্শনিক মনস্তত্ত্ব (Psychological Insight): তন্ত্রের বীর সাধনা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে তরবারি নিয়ে লড়াই নয়; এটি হলো নিজের কাম, ক্রোধ ও বাসনার বিরুদ্ধে লড়াই। সাধারণ মানুষ প্রলোভন দেখলে পালিয়ে যায় বা ভয় পায় (পশু ভাব)। কিন্তু বীর সাধক প্রলোভন ও ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়ান এবং নির্লিপ্ত থেকে তাকে জয় করেন। বীর ভাবের সাধনায় সাধক বোঝেন যে, যা দিয়ে মানুষের পতন হয় (যেমন- বাসনা বা জাগতিক ভোগ), সঠিক মানসিক নিয়ন্ত্রণে তাকেই মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

দিব্য ভাব (Divya Bhava - পরম প্রশান্তি ও অদ্বৈত চেতনা)

এটি মানব চেতনার সর্বোচ্চ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। বীর ভাবের সংগ্রামের শেষে সাধক যখন সমস্ত দ্বৈতবোধ ও দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে যান, তখন তাঁর মধ্যে যে ঈশ্বরীয় প্রশান্তি নেমে আসে, তাকেই 'দিব্য ভাব' বলে।

মূল শ্লোক:: "কামক্রোধাদিবর্জিতঃ সর্বভূতেষু সমদৃক। সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ স দিব্যভাব ইত্যুক্তঃ॥"  (মহানির্বাণ তন্ত্র, ৪র্থ উল্লাস / রুদ্রযামল তন্ত্র)

বঙ্গানুবাদ: যিনি কাম, ক্রোধ প্রভৃতি রিপু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, যিনি জগতের সকল প্রাণীকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন এবং যাঁর কাছে মাটির ডেলা, পাথর এবং খাঁটি সোনা— সবই সমান, তাঁর সেই মানসিক অবস্থাই হলো 'দিব্য ভাব'।

দার্শনিক মনস্তত্ত্ব (Psychological Insight): এটি হলো সম্পূর্ণ 'নন-ডুয়াল' বা অদ্বৈত অবস্থা। এই স্তরে সাধকের মন এতটাই শান্ত ও সমাহিত হয় যে, জাগতিক কোনো লাভ-ক্ষতি, নিন্দা-স্তুতি বা ভালো-মন্দ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি জগতের প্রতিটি ধূলিকণা থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষের মধ্যে কেবল পরব্রহ্ম বা ঈশ্বরের প্রকাশই দেখতে পান। তাঁর কাছে তখন আলাদা করে কোনো পূজার প্রয়োজন হয় না, তাঁর প্রতিটি শ্বাসই তখন ধ্যানে পরিণত হয়। তিনি জীবন্মুক্ত হয়ে যান।

সারসংক্ষেপ: তন্ত্রের এই ত্রিভাব মূলত মানুষের মানসিক যাত্রার কথা বলে: 

  1. পশু ভাব: অজ্ঞতা, ভয় ও নিয়মের দাসত্ব। 
  2. বীর ভাব: সাহসিকতা, মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও আত্ম-আবিষ্কারের লড়াই। 
  3. দিব্য ভাব: পরম জ্ঞান, সমদর্শন ও পূর্ণ স্বাধীনতা।

আগের আলোচনায় আমরা যে 'ত্রিভাব' (পশু, বীর ও দিব্য ভাব)-এর কথা জেনেছিলাম, এই সপ্ত আচার হলো সেই তিনটি ভাবেরই ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক রূপ।

এই ভাব গুলো সহজাত ভাবেই প্রকট পায়। এগুলো সাধনের বিষয় নয়। সাধনের বিষয় গুলো হলো আচার বা আচরণ। মানুষের চেতনার স্তর ভিন্ন হওয়ার কারণে সবার জন্য একই সাধনা বা আচারের বিধান তন্ত্রে দেওয়া হয়নি। 'কুলার্ণব তন্ত্র' (২য় উল্লাস) এবং 'বিশ্বসার তন্ত্র'-এ অত্যন্ত নিচুতলার স্থূল উপাসনা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ অদ্বৈত চেতনায় পৌঁছানোর এই সাতটি সোপানের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের সপ্ত আচার বলা হয়।

সপ্ত আচারের ক্রম:

তন্ত্রে এই সাতটি আচারকে নিচের থেকে ওপরের দিকে ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে। বিশ্বসার তন্ত্রের একটি শ্লোকে এই ক্রমটি বর্ণিত হয়েছে:

মূল শ্লোক: "বেদাদ্ বৈষ্ণবমুত্তমং বৈষ্ণবাচ্ছৈবমুত্তমম্। শৈবাদ্দক্ষিণমুত্তমং দক্ষিণাদ্ বামমুত্তমম্॥ বামাদ্ধি সিদ্ধান্তমুত্তমং সিদ্ধান্তাৎ কৌলমুত্তমম্। কৌলাৎ পরতরং নহি..."

বঙ্গানুবাদ: বেদাচার অপেক্ষা বৈষ্ণবাচার উত্তম, বৈষ্ণবাচার অপেক্ষা শৈবাচার উত্তম, শৈবাচার অপেক্ষা দক্ষিণাচার উত্তম, দক্ষিণাচার অপেক্ষা বামাচার উত্তম, বামাচার অপেক্ষা সিদ্ধান্তাচার উত্তম এবং সিদ্ধান্তাচার অপেক্ষা কৌলাচার উত্তম। কৌলাচার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই।

সপ্ত আচারের বিস্তারিত দার্শনিক বিশ্লেষণ

এই সাতটি আচারকে মনস্তাত্ত্বিক ও সাধনার কাঠিন্য অনুযায়ী ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হলো:

  • বেদাচার (Vedachara) এটি সাধনার একেবারে প্রথম ও প্রাথমিক স্তর। এই স্তরে সাধক মূলত বেদ ও স্মৃতির নির্দেশিত বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, যজ্ঞ, প্রাতঃ-সন্ধ্যা বন্দনা এবং কঠোর শুচিতা পালন করেন। এখানে ঈশ্বরকে লাভ করার চেয়ে পুণ্য অর্জন এবং পাপ ক্ষয়ের দিকেই সাধকের বেশি নজর থাকে। এটি সম্পূর্ণ দ্বৈতবাদের (Duality) স্তর এবং এটি 'পশু ভাব'-এর অন্তর্গত।

  • বৈষ্ণবাচার (Vaishnavachara) বেদাচারের কঠোর নিয়মকানুন থেকে বেরিয়ে সাধক যখন ভক্তি ও প্রেমের পথে অগ্রসর হন, তখন তাকে বৈষ্ণবাচার বলে। এই স্তরে সাধক অহিংসা ব্রত পালন করেন, কাম-ক্রোধ ত্যাগের চেষ্টা করেন এবং সমস্ত প্রাণীর মধ্যে ইষ্টদেবতার দর্শন করার চর্চা করেন। এখানে শুষ্ক নিয়মের চেয়ে মনের পবিত্রতা ও ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এটিও 'পশু ভাব'-এর অংশ।

  • শৈবাচার (Shaivachara) এই স্তরে সাধকের মন আরও অন্তর্মুখী হয়। বাহ্যিক উপাসনা ও ভক্তির পাশাপাশি সাধক ধ্যান, জপ, তপস্যা এবং যোগের আশ্রয় নেন। শিবের মতো বৈরাগ্য, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং আত্মানুসন্ধান এই আচারের মূল বিষয়। সাধক এখানে বুঝতে শুরু করেন যে, ঈশ্বর কেবল বাইরে নন, নিজের ভেতরেও বিরাজমান। এটিও পশু ভাব'-এর অন্তর্গত।

  • দক্ষিণাচার (Dakshinachara) দক্ষিণাচার হলো বেদ এবং তন্ত্রের এক অপূর্ব সমন্বয়। এখানে সাধক দেবী বা মহাশক্তির উপাসনা শুরু করেন, কিন্তু তা সম্পূর্ণ দক্ষিণ বা ডান হাত অর্থাৎ প্রচলিত ও সাত্ত্বিক নিয়মে। এই স্তরে সাধক রাতের বেলায় ইষ্টমন্ত্র জপ ও ধ্যানে মগ্ন হন। এটিও মূলত পশুভাবের শেষ এবং বীরভাবের প্রস্তুতি পর্ব। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই দক্ষিণাচার মতেই ভবতারিণীর আরাধনা করতেন।

  • বামাচার (Vamachara) এখান থেকেই শুরু হয় তন্ত্রের সবচেয়ে গোপন ও কঠিন স্তর বা 'বীর ভাব'। 'বাম' শব্দের অর্থ বিপরীত। সমাজ বা সাধারণ মানুষের কাছে যা অত্যন্ত গর্হিত, ভয়ের বা অপবিত্র, বামাচারী সাধক সেই ভয় ও সংস্কারকে জয় করার জন্য সরাসরি তার মুখোমুখি হন। এই স্তরেই সাধক শ্মশানে সাধনা এবং 'পঞ্চমকার' (মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন)-এর আক্ষরিক বা রূপক প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের কামনা ও ভয়কে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করার পরীক্ষা দেন। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ, গুরুর নির্দেশ ছাড়া এখানে পতন অনিবার্য।

  • সিদ্ধান্তাচার (Siddhantachara) বামাচারের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাধক যখন বুঝতে পারেন যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পবিত্র বা অপবিত্র, ভালো বা মন্দ বলে আলাদা কিছুই নেই— সবই সেই মহাশক্তিরই প্রকাশ, তখন তিনি সিদ্ধান্তাচারে উপনীত হন। এখানে সাধকের মন থেকে সমস্ত দ্বিধা ও দ্বৈতবোধ সম্পূর্ণ মুছে যায়। এটি বীর ভাব থেকে দিব্য ভাবে প্রবেশের প্রবেশদ্বার। এটি 'বীর ভাব'-এর অন্তর্গত রাখা হয়েছে।

  • কৌলাচার (Kaulachara) এটি হলো সাধনার সর্বোচ্চ শিখর বা 'দিব্য ভাব'। 'কুল' অর্থে শক্তি (কুণ্ডলিনী) এবং 'অকুল' অর্থে শিব (সহস্রার)। কুল ও অকুলের যে পরম মিলন, তা-ই কৌলাচার। কৌলাচারী সাধক বা 'কৌল'-এর কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক নিয়ম, বেশভূষা বা পূজাপদ্ধতি থাকে না। কুলার্ণব তন্ত্রে বলা হয়েছে— এক হাতে চন্দন আর অন্য হাতে কাদা থাকলেও কৌলের কাছে তা সমান। তিনি স্বয়ং শিবত্ব প্রাপ্ত হন বা আপনার ভাষায় "স্বয়ং চলমান শিব"-এ পরিণত হন। কূল গুরু, কূল বধূ, কূল পুরোহিত, কৌলিন — এই শব্দ গুলোর সঙ্গে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এদের স্বরুপ বদলে গেছে।

 বেদাচারী  নিজ প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি করতে গিয়ে নিজেকে কৌলাচারী  কৌলিন ব্রাহ্মণ  হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজের বারোটা বাজিয়ে গেছে। কূল কুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, চিন্ডাল ভেদাভেদ থাকে না। তা কেবল ব্যবহারিক স্তরে। অন্তরে সে শিবময়। 

এই জন্য  বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সকলের মধ্যে ব্রহ্ম বিচার করার ব্যবস্থা শাস্ত্র করেছে। এর নাম ভূতশুদ্ধি। 

ভূতশুদ্ধি কী?

তন্ত্রশাস্ত্রে একটি অত্যন্ত সুপরিচিত বাক্য রয়েছে— "দেবো ভূত্বা দেবং যজেৎ" (স্বয়ং দেবতুল্য না হয়ে দেবতার আরাধনা করা যায় না)। পাঠকদের জন্য এই বিষয়টি জানা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ হিন্দু তন্ত্র সাধনা ও পূজাবিধির একেবারে মূল ভিত্তিই হলো এই 'ভূতশুদ্ধি'। 'ভূত' (Bhuta) বলতে এখানে ভূত-প্রেত বোঝায় না, বরং পঞ্চভূত বা পাঁচটি মূল উপাদানকে (ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ, ব্যোম বা মাটি, জল, আগুন, বাতাস ও আকাশ) বোঝায়, যা দিয়ে আমাদের এই জাগতিক শরীর গঠিত। আর 'শুদ্ধি' (Shuddhi) অর্থ হলো পরম পবিত্রকরণ।

'ভূতশুদ্ধি তন্ত্র' এবং অন্যান্য প্রামাণ্য তন্ত্রশাস্ত্র (যেমন: মহানির্বাণ তন্ত্র, গৌতমীয় তন্ত্র বা তারভক্তি সুধাণর্ব) মূলত মানুষের স্থূল শরীরকে আধ্যাত্মিক উপায়ে পরিশুদ্ধ করে একটি 'দিব্য শরীর' বা দেব-শরীরে রূপান্তরিত করার সূক্ষ্ম জ্ঞান নিয়ে কথা বলে।

তন্ত্র অনুযায়ী, আমাদের এই সাধারণ শরীর মায়া, অহংকার এবং জন্মজন্মান্তরের পাপে পূর্ণ। এই অশুদ্ধ শরীর নিয়ে দেবতার পূজা করা যায় না। তাই পূজার শুরুতে ধ্যানের মাধ্যমে নিজ শরীরের পঞ্চভূতকে লয় করে, ভেতরের পাপকে ভস্ম করে এবং পুনরায় এক নতুন চিন্ময় শরীর গঠন করার যে তান্ত্রিক প্রক্রিয়া, তাকেই ভূতশুদ্ধি বলে।

ভূতশুদ্ধির মূল প্রক্রিয়া এবং বীজ মন্ত্রের প্রয়োগ

ভূতশুদ্ধি তন্ত্র এবং মহানির্বাণ তন্ত্রের ৫ম উল্লাসে এই প্রক্রিয়ার অত্যন্ত স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। পূর্বে আলোচিত চক্র ও বীজ মন্ত্রগুলোর মাধ্যমেই এই শুদ্ধি সম্পন্ন হয়। এর প্রধান তিনটি ধাপ হলো: উপাদানের লয় বা বিলীনকরণ, পাপপুরুষ দহন, দিব্য শরীর নির্মাণ।

মহানির্বাণ তন্ত্র (৫/৯৩) স্পষ্টভাবে বলছে—

"ভূতশুদ্ধিং বিধায়ৈবং কুর্যাৎ প্রাণস্য সংযমম্।" (অর্থাৎ, এভাবেই ভূতশুদ্ধি বিধান করে তবেই প্রাণায়াম বা পূজার অন্যান্য কর্ম করতে হবে।)

আসুন দেখি কিভাবে এর অনুষ্ঠান করতে হয়:

১. উপাদানের লয় বা বিলীনকরণ (Dissolution): সাধক ধ্যানে বসেন এবং কল্পনা করেন যে কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে ওপরের দিকে উঠছে। তিনি পৃথিবী তত্ত্বকে (মূলাধারের লঁ বীজ) জল তত্ত্বে (স্বাধিষ্ঠানের বঁ বীজে) লীন করেন। এরপর জলকে অগ্নিতে (মণিপুরের রঁ বীজে), অগ্নিকে বায়ুতে (অনাহতের যঁ বীজে) এবং বায়ুকে আকাশে (বিশুদ্ধ চক্রের হঁ বীজে) লীন করেন। সবশেষে আকাশ তত্ত্বকে অহংকারের সাথে মিলিয়ে পরমাত্মায় (সহস্রার চক্রে) লীন করা হয়। অর্থাৎ, স্থূল শরীরের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

আমরা "হযবরল" এই শব্দটি জানি। একে বিপরীত ক্রমে ল র ব য হ এর সঙ্গে “ং” যোগ করে মূলাধার থেকে উঠতে হবে। 

২. পাপপুরুষ দহন (Burning the Sinful Body): স্থূল শরীর লয় হওয়ার পর সাধক কল্পনা করেন যে তাঁর শরীরের বাম দিকে একটি কৃষ্ণবর্ণের ক্ষুদ্র পুরুষ রয়েছে, যা তাঁর সমস্ত পাপ, কাম, ক্রোধ ও নেতিবাচক প্রবৃত্তির প্রতিমূর্তি (একে 'পাপপুরুষ' বলা হয়)।

  • এরপর সাধক বায়ু বীজ (যঁ / Yam) জপ করে প্রাণায়ামের মাধ্যমে সেই পাপপুরুষের শরীরকে শোষণ করেন বা শুকিয়ে ফেলেন। বাম নাকে বায়ু আকর্ষন করে। 
  • তারপর তিনি অগ্নি বীজ (রঁ / Ram) জপ করে কল্পনার শক্তিতে সেই শুকিয়ে যাওয়া পাপপুরুষকে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করেন। অর্থাৎ, নিজের ভেতরের সমস্ত মালিন্য পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ডান নাকের ছিদ্র দিয়ে রেচন করবে। এরপর:

৩. দিব্য শরীর নির্মাণ (Recreation of Divine Body): পাপ ভস্ম হওয়ার পর সাধক আকাশ বা অমৃত বীজ (বঁ / Vam বা হঁ / Ham - সম্প্রদায় ভেদে) জপ করেন। তিনি কল্পনা করেন যে সহস্রার চক্রের পরম শিবের কাছ থেকে এক স্নিগ্ধ অমৃতধারা ঝরে পড়ছে এবং সেই ভস্মের ওপর পতিত হয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন, পবিত্র, জ্যোতির্ময় ও দেবতুল্য শরীর গঠন করছে। শেষে পৃথিবী বীজ (লঁ / Lam) জপ করে সেই নতুন দিব্য শরীরকে দৃঢ় ও সুকঠিন করা হয়।

এগুলো মেন্টাল এক্সারসাইজ বা মানসিক কসরত। পাঠকদের জন্য শাস্ত্রীয় প্রামাণ দিচ্ছি দেখুন।

শাস্ত্রীয় প্রামাণিকতা ও গুরুত্ব

তন্ত্রশাস্ত্রে বলা হয়েছে, ভূতশুদ্ধি ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি জপ, পূজা বা হোমাগ্নি করেন, তবে তা সম্পূর্ণ নিষ্ফল হয়। এটি কেবল বাহ্যিক স্নান বা শরীর ধোয়া নয়, এটি হলো সাধকের গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিশুদ্ধি। এর মাধ্যমে সাধক নিজের মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন করেন যে, "আমি আর সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ নই, আরাধনার জন্য আমি স্বয়ং দেবতার মতোই পবিত্র।"

পর্যায় ১: পাপপুরুষের ধ্যান (অহংকার ও নেতিবাচক সত্তাকে চিহ্নিত করা) প্রথমেই সাধককে নিজের ভেতরের সমস্ত পাপ, কুচিন্তা ও নেতিবাচকতাকে একটি কাল্পনিক স্থূল রূপে (যাকে 'পাপপুরুষ' বলা হয়) চিন্তা করতে হয়।

মূল শ্লোক (মহানির্বাণ তন্ত্র ৫/৯৩-৯৪): "বামকুক্ষৌ স্থিতং ধ্যায়েৎ পাপপুরুষং কজ্জলপ্রভম্। ব্রহ্মহত্যা-শিরোযুক্তং স্বর্ণস্তেয়-ভুজদ্বয়ম্॥"

অনুবাদ: সাধক ধ্যান করবেন যে, তাঁর বাম দিকের কুক্ষিদেশে (পেটে) কজ্জলের (কাজলের) মতো ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক পাপপুরুষ অবস্থান করছে। ব্রহ্মহত্যা তার মস্তক এবং স্বর্ণ চুরি করা তার দুই হাত। (শ্লোকের পরবর্তী অংশে মদ্যপানকে হৃদয় এবং গুরুপত্নী গমনকে পদযুগল বলা হয়েছে)।

দার্শনিক জ্ঞান: দর্শনশাস্ত্র অনুযায়ী, আমাদের ভেতরের নেতিবাচক প্রবৃত্তি বা 'ইগো' (Ego) অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাকে সহজে ধরা যায় না। তন্ত্র এখানে একটি দারুণ মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। আমাদের সমস্ত বদভ্যাস, পাপবোধ এবং অবদমিত বাসনাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট 'রূপ' দেওয়া হচ্ছে। শত্রুকে ধ্বংস করার আগে তাকে চেনা এবং চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

পর্যায় ২: পাপপুরুষকে শোষণ বা শুষ্ক করা (বায়ু বীজের প্রয়োগ)

মূল শ্লোক (মহানির্বাণ তন্ত্র ৫/৯৬): "যঁ-কারং বায়ুবীজঞ্চ ধ্যায়ন্ ধূম্রবর্ণং তদূর্দ্ধ্বগম্। তেন পূরক-যোগেন শোষয়েৎ পাপপুরুষম্॥"

অনুবাদ: এরপর ধূম্রবর্ণের বায়ু বীজ 'যঁ' (Yam) ধ্যান করে পূরক (শ্বাস গ্রহণ) যোগের মাধ্যমে সেই পাপপুরুষকে শোষণ বা শুষ্ক করতে হবে।

দার্শনিক জ্ঞান: 'বায়ু' হলো অনাসক্তি এবং গতির প্রতীক। কোনো নেতিবাচক অভ্যাস বা অহংকারকে দূর করার প্রথম ধাপ হলো তার থেকে নিজের আসক্তি বা মনোযোগ (জীবনরস) সরিয়ে নেওয়া। রস শুকিয়ে গেলে পাপপুরুষ দুর্বল ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। এটি হলো 'প্রত্যাহার' বা জগৎ থেকে মনকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।

পর্যায় ৩: পাপপুরুষ দহন (অগ্নি বীজের প্রয়োগ)

মূল শ্লোক (মহানির্বাণ তন্ত্র ৫/৯৭): "রঁ-কারং বহ্নিবীজঞ্চ ধ্যায়ন্ রক্তবর্ণং তদূর্দ্ধ্বগম্। কুম্ভকেন ততো দহেৎ পাপপুরুষং তং ক্ষণাৎ॥"

অনুবাদ: তারপর রক্তবর্ণের অগ্নি বীজ 'রঁ' (Ram) ধ্যান করে কুম্ভক (শ্বাস ধরে রাখা) অবস্থায় সেই শুষ্ক পাপপুরুষকে ক্ষণকালের মধ্যে দহন বা সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত করতে হবে।

দার্শনিক জ্ঞান: 'অগ্নি' হলো পরম জ্ঞান বা তপস্যার প্রতীক। শুষ্ক কাঠে যেমন সহজেই আগুন ধরে, তেমনি আসক্তিহীন মনের অহংকারকে তপস্যা ও আত্মজ্ঞানের আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে হয়। এই দহন প্রক্রিয়ার অর্থ হলো— "আমার পুরোনো আমিত্ব বা অজ্ঞানতা সম্পূর্ণরূপে ভস্ম হয়ে গেল।"

পর্যায় ৪: অমৃতস্নান ও দিব্য দেহ নির্মাণ (চন্দ্র বা বরুণ বীজের প্রয়োগ)

মূল শ্লোক (মহানির্বাণ তন্ত্র ৫/৯৮): "ঠঁ-কারং চন্দ্রমোবীজং ধ্যায়ন্ শুক্লবর্ণং তদূর্দ্ধ্বগম্। (টীকা: অনেক তন্ত্রে এখানে 'বঁ' বা বরুণ বীজ ব্যবহৃত হয়) রেচকেন ততোঽমৃতং স্রাবয়েৎ ললাটস্থ-সুধাংশুতো। তেনামৃত-প্রবাহেন প্লাবয়েৎ ভস্ম তৎক্ষণাৎ॥"

অনুবাদ: এরপর শুক্লবর্ণের চন্দ্র বীজ 'ঠঁ' (Tham) ধ্যান করে রেচক (শ্বাস ত্যাগ) এর মাধ্যমে ললাটস্থিত চন্দ্র থেকে অমৃতধারা নির্গত করবেন এবং সেই অমৃতপ্রবাহে ভস্মকে প্লাবিত করবেন।

দার্শনিক জ্ঞান: কেবল অহংকার ধ্বংসই শেষ কথা নয়, ধ্বংসের পর প্রয়োজন নবসৃষ্টি। 'অমৃত' বা চন্দ্রসুধা হলো ঈশ্বরের করুণা, প্রেম ও স্নিগ্ধতার প্রতীক। অহংকার শূন্য হওয়ার পর সাধকের আজ্ঞা বা সহস্রার চক্র থেকে যে আধ্যাত্মিক করুণাধারা বর্ষিত হয়, তা দিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন, পবিত্র ও চিন্ময় দেহ গঠিত হয়। এটি হলো সাধকের আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম।

পর্যায় ৫: ঘনীভবন বা দৃঢ়ীকরণ (পৃথিবী বীজের প্রয়োগ)

মূল শ্লোক (মহানির্বাণ তন্ত্র ৫/৯৯): "লঁ-কারং পৃথিবীবীজং ধ্যায়ন্ পীতবর্ণং তদূর্দ্ধ্বগম্। তেনামৃত-প্রবাহেন ঘনীকুর্যাৎ কলেবরম্॥"

অনুবাদ: অবশেষে পীতবর্ণের (হলুদ) পৃথিবী বীজ 'লঁ' (Lam) ধ্যান করে সেই অমৃতপ্রবাহ দ্বারা নবগঠিত চিন্ময় শরীরকে ঘনীভূত বা সুকঠিন করতে হবে।

দার্শনিক জ্ঞান: 'পৃথিবী' হলো স্থায়িত্ব এবং বাস্তবতার প্রতীক। কেবল ধ্যানের স্তরে দিব্য শরীর লাভ করলেই হবে না, তাকে জাগতিক পৃথিবীতে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করতে হবে। এই নতুন পবিত্র দেহটি এবার পরমাত্মার আরাধনা করার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।

পরিশিষ্ট:

এভাবেই সপ্ত আচার এবং ত্রি ভাব দ্বারা আমরা নিজেকে পবিত্র করি। এর সঠিক সঠিক শিক্ষার জন্য গুরু দারকার। যিনি হাতে কলমে শিখিয়ে দেবেন। বই পড়ে বা ব্লগ পড়ে হবে না। আমার গুরুর উদ্দেশে এই লেখা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিজ শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করা। 

—আমি অধম আমার গুরুই ভালো জানেন।

সপ্ত আচার ও ত্রিভাবের সম্পর্ক

তন্ত্রশাস্ত্রে চেতনার ঊর্ধ্বমুখী যাত্রার ৭টি সোপান

১. পশু ভাব (প্রাথমিক স্তর) দ্বৈতবোধ ও নিয়মনিষ্ঠা
বেদাচার (Vedachara)
এটি সাধনার প্রাথমিক স্তর। এখানে সাধক বেদ নির্দেশিত বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, যজ্ঞ ও কঠোর শুচিতা পালন করেন। মন তখনো জাগতিক নিয়মে আবদ্ধ থাকে।
বৈষ্ণবাচার (Vaishnavachara)
এই স্তরে নিয়মের চেয়ে ভক্তি ও প্রেমের উদয় হয়। সাধক অহিংসা ব্রত পালন করেন এবং জগতের সকল প্রাণীর প্রতি দয়াশীল হওয়ার অভ্যাস করেন।
শৈবাচার (Shaivachara)
সাধক শিবের ন্যায় ধ্যানমগ্ন ও অন্তর্মুখী হন। বাহ্যিক উপাসনার পাশাপাশি আত্মানুসন্ধান ও বৈরাগ্যের চর্চা শুরু হয়।
দক্ষিণাচার (Dakshinachara)
বেদ ও তন্ত্রের অপূর্ব সমন্বয়। সাধক মহাশক্তির উপাসনা করেন সাত্ত্বিক নিয়মে। এটি পশু ভাবের শেষ এবং বীর ভাবের প্রস্তুতি পর্ব।
২. বীর ভাব (সংগ্রামের স্তর) সংস্কার ও ভয় জয় করা
বামাচার (Vamachara)
তন্ত্রের অত্যন্ত গোপন ও কঠিন পথ। সমাজ যা ভয় পায় বা অপবিত্র মনে করে, সাধক সাহসের সাথে তার মুখোমুখি হয়ে নিজের কাম ও ভয়কে ভস্মীভূত করেন (পঞ্চমকারের প্রয়োগ)।
সিদ্ধান্তাচার (Siddhantachara)
বামাচারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাধক যখন বোঝেন যে পবিত্র-অপবিত্র বা ভালো-মন্দ বলে আলাদা কিছু নেই, সবই মহাশক্তির প্রকাশ— তখনই তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
৩. দিব্য ভাব (মুক্তির স্তর) অদ্বৈত চেতনা ও পরম প্রশান্তি
কৌলাচার (Kaulachara)
সাধনার সর্বোচ্চ শিখর বা অবধূত অবস্থা। সাধকের কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক নিয়ম বা বেশভূষা থাকে না। তিনি সমস্ত দ্বৈতবোধের ঊর্ধ্বে উঠে স্বয়ং শিবত্ব প্রাপ্ত হন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন